আমার স্ত্রী কখনো একা বাথরুমে যায় না।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পাহারা দিতে হয়।
একবার দেরি হচ্ছে দেখে দরজায় টুকা দিয়ে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।
দেখি দরজাটা খুলে যাচ্ছে। সেদিন বুঝলাম সে ভেতর থেকে দরজা আটকায় না।
প্রথম প্রথম মনে হত ভয়ে এরকমটা করে। বিয়ের পর নতুন বাড়িতে এসেছে। হয়তো এখানে মানিয়ে নিতে পারছে না। কিন্তু পরে দেখলাম সে সবসময়ই এমন।
অন্য কোনোকিছুতে তার বিন্দুমাত্র ভয় নেই। সন্ধ্যার পরও একা ছাদ থেকে কাপড় আনতে পারে। মাঝেমাঝে অনেক রাতে একা বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থাকে। শুধু বাথরুমে যেতে হলেই তার চেহারা বদলে যায়। আমার হাতটা আলতো করে ধরে বলে,
“অ্যাই শুনো না…”
তখন তাকে আর স্বাভাবিক মানুষ বলে মনে হয় না। চেহারাটা কেমন যেন সাদাটে হয়ে যায়। কাঁপাকাঁপা ঠোঁটে অস্ফুট স্বরে বলে,
“আমার খুব ভয় করছে।”
.
সেবার শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ব্যাপারটা ভুলেই গিয়েছিলাম। আমার তিন শ্যালিকা। তিনজনই দুলাভাই ভক্ত। শ্বশুর মারা গেছেন বহু বছর আগে। শ্বাশুড়ি আছেন। তিনি আমাকে শ্বশুরের কমতি বুঝতে দেন না।
আর শ্যালিকাদের কথা কী বলব! এত খাতিরযত্ন করল, আমি ওই বাথরুমের ব্যাপারটা একরকম ভুলেই গেলাম।
ঘটনাটা ঘটল তৃতীয় দিন।
তখন রাতের কয়টা বাজে জানি না। তীব্র ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্ন দেখে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসেছি। দেখি নাবিলা নেই। বিছানা, বেলকনি, ড্রয়িং কোথাও নেই।
আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।
ভয়েভয়ে শোবার ঘরের সাথে লাগোয়া বাথরুমটার দিকে তাকালাম। আর ঠিক তখনি নাবিলা বাথরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে এল। একেবারে স্বাভাবিক তার চেহারা। আর সেটাই আমি সহ্য করতে পারছিলাম না।
এটা কীভাবে হতে পারে? যে মেয়ে দিনের আলোতেও আমাকে ছাড়া বাথরুমে যায় না, সে এত রাতে একা…
নাবিলা আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লাজুক হেসে বলল,
“অ্যাই, ঘুম আসছে না?”
“নাবিলা, তোমার কি ভয় লাগছে না?”
“ভয় লাগবে কেন? আমি কি ছোটো বাচ্চা নাকি? আসো ঘুমাবে।”
বলে শুয়ে পড়ল। আমি আর ঘুমাতে পারলাম না। মাথায় শুধু একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল। তবে কি নাবিলার ভয় কেটে গেছে?
.
পরদিন সকালে সবচেয়ে ছোটো শ্যালিকাকে কাছে ডাকলাম। তার বয়স কেবল সতেরোতে পড়েছে। দুরন্ত মেয়ে। চঞ্চল দুটি চোখ সারাক্ষণ টইটই করতে থাকে। কাছে ডেকে ফিসফিস করে বললাম,
“তোমার নাবিলা আপু কি বাথরুমে যেতে ভয় পায়?”
সে প্রশ্ন শুনে হেসে গড়িয়ে পড়তে শুরু করল।
“দুলাভাই যে কী বলেন! আপু ভয় পাবে, তাও আবার বাথরুমে যেতে! হাহাহা! আপু কি ছোটো বাচ্চা?”
অঙ্কটা কিছুতেই মিলাতে পারছিলাম না। ভয় যদি না পায়, তাহলে এতদিন আমাকে বাথরুমের সামনে পাহারায় রাখল কেন? তবে কি সত্যিই নতুন নতুন বিয়ে হয়েছে বলে…
যেটাই হোক, নাবিলার ভয় কেটে গেছে দেখে আনন্দ হচ্ছিল। কিন্তু সেই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
.
সেদিন বাসায় ফিরে তেমন কিছু ঘটল না। নাবিলার আচরণ স্বাভাবিক। সে নিজে চার পদের রান্না করল। আমি তার কাজে টুকটাক সাহায্য করলাম।
রাত নয়টার দিকে নাবিলা হঠাৎ আমার গা ঘেঁষে দাঁড়ালো।
তার চেহারা বর্ণহীন। ঠোঁট কাঁপছে। আমার হাতটা আলতো করে ধরল।
“শুনো না…”
জিজ্ঞেস করলাম, “ভয় করছে?”
নাবিলা আরো শক্ত করে আমাকে ধরল। মাথাটা আমার হৃদপিণ্ডের সাথে মিশিয়ে দিলো।
আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একফোঁটা ঘাম নেমে গেল। ভাঙাভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করলাম,
“বাথরুমে যাবে?”
কফিনের শেষ পেরেক মারার মতো শেষ কথাটা বলল নাবিলা।
“হুমম।”
সবকিছু আমার কল্পনার বাইরে। যে মেয়ে বাপের বাড়িতে হেসেখেলে কাটিয়েছে। আমি নিজে দেখেছি গভীর রাতে একা বাথরুমে যেতে। তার মধ্যে ভয়ের ছিটেফোঁটাও ছিল না। সেই মেয়ে এখানে এসে আবার ভয় পাচ্ছে। হিসেবটা এখানেই গড়মিল হয়ে যাচ্ছে।
.
এই প্রথম অভদ্রের মতো একটা কাজ করলাম।
নাবিলা বাথরুমে। ভেজানো দরজায় কান পেতে রাখলাম। কোনো ভদ্রলোক এটা করতে পারে না। আমিও করতাম না। কিন্তু ইদানীং যা হচ্ছে, তাতে রহস্য ভেদ না করেও থাকতে পারছি না।
তাই কান খাড়া করে শুনতে লাগলাম। এবং এই প্রথম এমন একটা জিনিস আবিষ্কার করলাম, যেটা কখনো কল্পনাও করতে পারিনি।
ভেতরে নাবিলা কার সাথে যেন কথা বলছে। কানটা একেবারে দরজার সাথে লাগিয়ে দিতেই স্পষ্ট শুনতে পেলাম। একটা লোক বলছে,
“লাল চাদর না কি নীল চাদর?”
নাবিলা বলছে,
“আমার স্বামী দরজার কাছে দাঁড়ানো। তাকে জিজ্ঞেস করে উত্তর দেই?”
লোকটা আবারো বলছে,
“লাল চাদর না কি নীল চাদর?”
নাবিলা বলছে,
“দরজা কিন্তু খোলা। ওকে জিজ্ঞেস করেই উত্তরটা দিচ্ছি।”
বলেই বেরিয়ে এল। প্রতিবারের মতো এবারও তার চেহারা ঘামে জবজবা। ওড়না দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে অন্য ঘরে চলে গেল। আমি দরজাটা খুলে ভেতরে চলে গেলাম।
মানুষ তো দূর, একটা পোকার চিহ্নমাত্র নেই। ভেন্টিলেটর দিয়ে বাইরে তাকালাম। এই ছোট্ট ফাঁক দিয়ে একটা আস্ত লোক ভেতরে আসবে-যাবে এটা অসম্ভব। আবার বাইরে থেকে কথা বলাও যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ আমাদের ফ্ল্যাটটা তিনতলায়।
তাহলে নাবিলা কার সাথে কথা বলল? লোকটা গেলই বা কোথায়?
.
সেবার বাৎসরিক ছুটিতে ঠিক করলাম দেশের বাইরে বেড়াতে যাব। নাবিলা যেহেতু জাপানে চারবছর পড়াশোনা করেছে, তার প্রথম পছন্দ ছিল জাপান। সুতরাং উড়ে চললাম উদীয়মান সূর্যের দেশ জাপানে।
ওসাকা, জাপান।
নাম্বার ব্যস্ত রাস্তা থেকে একটু ভেতরে একটি হোটেলের দ্বিতীয় তলায় উঠেছি আমরা।
নাবিলা জাপানে আসার খবর শুনে তার কিছু পুরনো বান্ধবীরা এসেছিল। সবাই দেখা করে চলে গেছে। রয়ে গেছে শুধু একজন। তার নাম ইউকি। পুরোদস্তুর সাদা চামড়ার মেয়ে। মোমের মতো চেহারা। পরনে উইকাতা নামের হালকা সুতির পোশাক।
মেয়েটি আসার পর থেকেই আমার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল। দেখে মনে হচ্ছে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে। কিন্তু কোনো এক কারণে বলতে পারছে না। কারণটা যে নাবিলা, সেটা তার চোরা দৃষ্টি দেখেই আন্দাজ করা যায়।
একবার নাবিলা কী একটা আনতে গেল, তখনি সুযোগ পেয়ে গেল মেয়েটা। ইতস্তত করে কিছুটা এগিয়ে এসে বসল আমার পাশে। ফিসফিস করে ভাঙা ইংরেজিতে বলল,
“নাবিলা কি বাথরুমে একা যায়?”
আমার দেহে যেন চার হাজার ভোল্টের বৈদ্যুতিক শক লাগলো। বাংলাদেশ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার কিলোমিটার দূরের এই মেয়ে কীভাবে জানলো নাবিলার ভয়ের কথা? তবে কি নাবিলার ভয়ের সাথে এই দেশের কোনো যোগসূত্র আছে?
ইউকি একটি কাগজে ঠিকানা লিখে দিয়ে চলে গেল। যাবার সময় বলল আমি যেন তার সাথে দেখা করি।
.
রাতে নাবিলা দুবার বাথরুমে গেল। একবারও আমাকে ডাকলো না। দরজার কাছে দাঁড়াতেও বলল না। সময়ে সময়ে অঙ্কটা আরো জটিল হয়ে যাচ্ছে আমার কাছে।
পরদিন সকালে নাবিলাকে ঘুমন্ত অবস্থায় হোটেলে রেখে ইউকির কাছে ছুটলাম। মেয়েটা আমার অপেক্ষায় ছিল।
ছোট্ট সিরামিকের হাতলবিহীন কাপে ওচা দিয়ে আমাকে আপ্যায়ন করল। আমি চুমুক দিতেদিতে অতীতের সব কথা খুলে বললাম। শোনা শেষে ইউকি ভাঙা ইংরেজিতে বলে উঠল,
“আমি ঠিকই ভেবেছিলাম। ওটা নাবিলার পিছুও নিয়েছে।”
“ওটা? কে ওটা?”

“আকা মান্তো।”
নামটা বলার সময় ইউকির গলা কেঁপে উঠা আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম। এই মুহূর্তে তার চেহারা ততটাই ফ্যাকাশে, যতটা নাবিলা বাথরুমে যাবার সময় হয়।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী নাম বললেন?”
“আকা মান্তো। একটা বদ লোক। লাল আলখাল্লা পরে স্কুলের বাথরুমে দেখা দেয়।”
“আপনি কী বলছেন আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। একটু খুলে বলুন।”
তারপর ইউকি যা যা বলল তা হলো এমন,
জাপানে একটি প্রাচীন মিথ আছে। একটা লাল আলখাল্লা পরা লোক স্কুলের বাথরুমে হঠাৎ দেখা দেয়। এবং জিজ্ঞেস করে,
“লাল চাদর না কি নীল চাদর?”
আমার বুকের ভেতর হিম হয়ে গেল। আমিও তো বাথরুমের কাছে কান পেতে শুনেছি একটা লোক নাবিলাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “লাল চাদর না কি নীল চাদর?”
ইউকি আরো বলল, নাবিলা আর ইউকি যখন জাপানে পড়াশোনা করছিল, তখন পড়াশোনার পাশাপাশি একটি স্কুলে পার্টটাইম চাকরি করত। সেই স্কুলের বাথরুমেই ওদের সাথে দেখা হয় আকা মান্তোর। সৌভাগ্যক্রমে ওরা একে অন্যের সময় দরজার বাইরে অপেক্ষায় ছিল বলে, “বান্ধবীকে জিজ্ঞেস করে জানাচ্ছি।” বলে বেঁচে ফিরতে পেরেছে।
তা না হলে লাল চাদর বললে ছুরি দিয়ে আঘাত করে রক্তাক্ত অবস্থায় মেরে ফেলে। আর নীল বললে রক্ত শুষে নিয়ে শরীর নীল করে মেরে ফেলে।
.
সব শুনে আমার মাথা ভনভন করছিল। পৃথিবীতে কত বিচিত্র জিনিস রয়েছে, যা হয়তো আমরা কল্পনাও করতে পারি না। তার মধ্যে আকা মান্তো একটি।
এই জিনিসটা আমি এত সহজে বিশ্বাস করতাম না। তবে আকা মান্তোর গলা আমি নিজের কানে শুনেছি।
আসার সময় ইউকি বলে দিয়েছে, নাবিলাকে যেন কোনো স্কুলের বাথরুমে যেতে না দেই। আর যদি যায়ও, একা যাতে না থাকে।
.
দেশে ফেরার পর বাড়িওয়ালার সাথে দেখা করলাম। এবং তার মুখ থেকে সত্যিটা জানার পর আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল।
এ-বাড়িটা আগে বাড়ি ছিলই না। বছর পাঁচেক আগে এই বিল্ডিংয়ে একটি স্কুল ছিল!
তাইতো শ্বশুরবাড়িতে নাবিলা ভয় পায় না। জাপানের হোটেলেও ভয় পায় না। ভয় পায় শুধু সেখানে, যেখানে স্কুল আছে বা আগে ছিল।
.
বাড়িটা ছেড়ে দিলাম একদিনের মধ্যেই। নতুন বাড়িতে উঠে সবকিছু গোছগাছ করছি। নাবিলা হাতের কাজ শেষ করে বাথরুমে গোসল করতে ঢুকেছে। আমি ড্রইং রুমের জিনিসপত্র ঠিকমতো বসানো হয়েছে কি না দেখছিলাম। এমন সময় বাড়িওয়ালার কলেজপড়ুয়া মেয়ে তিশা কফি নিয়ে এল। বলল,
“ভাইয়া, আপনাদের জন্য কফি। মা পাঠিয়েছেন।”
একটি ছোট্ট থ্যাঙ্কিউ দিয়ে কফির মগ রাখলাম। বললাম,
“স্টোররুমে কিছু বস্তা দেখলাম। আগের ভাড়াটিয়ার নাকি?”
মেয়েটি বলল, “হ্যাঁ, ভাইয়া। আগে যারা ছিল তারা ফেলে গেছে। দরকারি কিছু নেই। কিছু পরীক্ষার উত্তরপত্র।”
“পরীক্ষার উত্তরপত্র এখানে কেন?”
“আপনাকে হয়তো জানানো হয়নি ভাইয়া, আগে এই ফ্লোর সহ উপরের দুই ফ্লোরে একটা হাইস্কুল ছিল।”
কথাটা শুনেই আমার বুকের ভেতর ধড়াস করে উঠল।
এটা যদি স্কুল হয়, তবে নাবিলা একা বাথরুমে কী করছে?
