শাস্ত্রীয়সংগীতের বহুমাত্রিক সৌন্দর্য, ঐতিহ্য ও বৈচিত্র্যকে নাট্যরূপে দর্শকের সামনে তুলে ধরতে হংসধ্বনির আয়োজনে মঞ্চস্থ হলো বিশেষ নাটক ‘সুর সম্মিলন’। ভারতীয় উপমহাদেশের শাস্ত্রীয়সংগীতের পাশাপাশি কর্ণাটকী, পারস্য, চৈনিক ও পাশ্চাত্য শাস্ত্রীয়সংগীতের বিভিন্ন ধারা এক মঞ্চে উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে আয়োজনটি হয়ে ওঠে সংগীতপ্রেমীদের জন্য এক ব্যতিক্রমী সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা।‘সুর সম্মিলন’-এর গ্রন্থনা ও পরিচালনা করেছেন শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী সাইফুল তানকার। নাট্যনির্দেশনায় ছিলেন রতন মজুমদার।অনুষ্ঠানের শুরুতে তানপুরায় সুর বাঁধা ও সা স্বর সাধার মধ্য দিয়ে আয়োজনের উদ্বোধন করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বরেণ্য শাস্ত্রীয়সংগীতগুরু পণ্ডিত অসিত দে। এরপর অতিথিদের ফুল, উত্তরীয় ও স্মারক প্রদান করা হয়।
নাটকটির পরিবেশনায় ছিল সংগীতের বিভিন্ন শাস্ত্রীয় ধারার বৈচিত্র্যময় উপস্থাপনা। সমবেত ধ্রুপদ পরিবেশনার মধ্য দিয়ে আয়োজনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্ব শুরু হয়।এতে অংশ নেন অরণি চৌধুরী, সংযুক্তা, সোনাল সিনহা, প্রতিমা রাণী নট্ট, ওম অভ্র চৌধুরী, ইমরান সরকার, অভিজীত বর্ম্মন, অমিত কর্মকার, ইমন খান ও কবিতা মনি।
এরপর একে একে মঞ্চে পরিবেশিত হয় বিভিন্ন ধারার শাস্ত্রীয়সংগীত। একক খেয়াল পরিবেশন করেন আর্য শ্রেষ্ঠা ঘোষ। কর্ণাটকী শাস্ত্রীয়সংগীত পরিবেশন করেন তুলশী দেবী। মালকোষ রাগে খেয়াল ও তারানা পরিবেশন করেন সুদীপ দত্ত অহন।চৈনিক শাস্ত্রীয়সংগীতের দ্বৈত পরিবেশনায় অংশ নেন ঐক্যজিৎ ও অরুণা। বৈরাগী রাগে খেয়াল পরিবেশন করেন রথিন টিকাদার। পারস্যের শাস্ত্রীয়সংগীত পরিবেশন করেন ফারজানা মেঘলা, কবিতা মনি ও রোদশী। একক ঠুমরি পরিবেশন করেন প্রণামি পোদ্দার।
এছাড়া পাশ্চাত্য শাস্ত্রীয়সংগীতের অপেরা পরিবেশন করেন জেমিমা তাহসিন রাত্রি এবং ভজন পরিবেশন করেন প্রিয়ন্তি পোদ্দার।
‘সুর সম্মিলন’-এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সংগীত পরিবেশনার পাশাপাশি নাট্যরূপের ব্যবহার। বিভিন্ন চরিত্র ও ভূমিকায় অভিনয় করেন অর্ক সরকার, বিত্ত সোম, হুমায়ন আহমেদ রাহাত, চার্লি, রথিন টিকাদার, অনির্বাণ হালদার, সিফাত প্রধান, তাকবির খান ও অংকিতা মজুমদার। ফলে পুরো আয়োজনটি কেবল একটি সংগীতানুষ্ঠান হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং সংগীত, অভিনয় ও নাট্যরীতির সমন্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ মঞ্চনাট্যের আবহ তৈরি করে।
অনুষ্ঠানের সংগীত পরিবেশনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন সহযোগী শিল্পীরাও। তবলায় সংগত করেন গৌতম কুমার সরকার ও প্রশান্ত কুমার দাস। সাজযন্ত্রে ছিলেন জাহিদ, ভায়োলিনে নুপুর। হারমোনিয়ামে ছিলেন সাইফুল তানকার ও রথিন টিকাদার। তানপুরায় সংগত করেন প্রতিমা নট্ট ও ইমরান সরকার। আবহসংগীত ও কিবোর্ডে ছিলেন ফরহাদ হোসেন।প্রায় দেড় ঘণ্টার এই বিশেষ প্রযোজনার মধ্য দিয়ে শাস্ত্রীয়সংগীতের বিভিন্ন ধারার পারস্পরিক সম্পর্ক, ঐতিহ্য এবং নান্দনিক বৈচিত্র্য তুলে ধরার প্রয়াস ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ধ্রুপদ থেকে খেয়াল, ঠুমরি থেকে ভজন, কর্ণাটকী থেকে পারস্যের সংগীত, চৈনিক সংগীত থেকে পাশ্চাত্য অপেরা- বিভিন্ন সংগীতধারার এই সম্মিলিত উপস্থাপনা ‘সুর সম্মিলন’-কে দিয়েছে স্বতন্ত্র মাত্রা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি শাস্ত্রীয়সংগীতগুরু পণ্ডিত অসিত দে, বিশেষ অতিথি হিসেবে প্রফেসর নাদিয়া সোমা সামাদ (অধ্যক্ষ, সরকারি সংগীত কলেজ) উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রিপন কুমার বিশ্বাস। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন লাবণী সাহা (সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, সরকারি সংগীত কলেজ)।
নাটক সমাপ্তির পর প্রযোজনাটির পরিচালক সাইফুল তানকার এবং নাট্যনির্দেশক রতন মজুমদারসহ অনুষ্ঠানে উপস্থিত সম্মিলন অতিথিবৃন্দ তাদের অনুভূতি প্রকাশ করেন।
নাটকটি প্রসঙ্গে পণ্ডিত অসিত দে বলেন, শাস্ত্রীয়সংগীতের এমন নাটকীয় উপস্থাপন একটি অভিনব ধারণা যা ইতিপূর্বে দেখা যায়নি। শাস্ত্রীয়সংগীতকে শুধু পরিবেশনার বিষয় হিসেবে নয়, বরং নাট্য ও মঞ্চশিল্পের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার যে প্রয়াস ‘সুর সম্মিলন’-এর মধ্য দিয়ে দেখা গেছে, তা বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য।

