লেখক: তাইমুর মাহমুদ শমীক
আমাদের স্কুলের গেটে যে দারোয়ান দাঁড়াতেন, ক্লাসের ছেলেরা তাকে নিয়ে মজা করতো।আমিও করতাম। হেসে গড়িয়ে পড়তাম ফ্লোরে।উনি আমার আব্বা।চার বছর আমরা দুইজন ওই স্কুলে এমনভাবে ছিলাম, যেন কেউ কাউকে চিনি না।আমার নাম রাকিব। খিলগাঁওয়ের তালতলা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে আমি ভর্তি হয়েছিলাম ক্লাস থ্রিতে।
তখন আমাদের অবস্থা খারাপ ছিলো না। তালতলা মার্কেটে আব্বার একটা স্টেশনারি দোকান ছিলো। খাতাকলম আর ফটোকপির ব্যবসা। মাস শেষে হাতে টাকাপয়সা থাকতো।দোকানে বসে আব্বা কাস্টমারের বাচ্চাদের ফ্রি পেন্সিল ধরিয়ে দিতেন। আম্মা রাগ করতেন খুব। বিব্রত ভঙ্গিতে হেসে আব্বা কৈফিয়ত দিতেন, বাচ্চা মানুষ, দুইটা পেন্সিল দিলে ব্যবসা লাটে উঠবো?দরাজ হৃদয়ের মানুষটার হাতটা তখন খোলা ছিলো।
আমি যখন ক্লাস সিক্সে, আম্মার কিডনি রোগ ধরা পড়লো।ডায়ালাইসিস চললো দেড় বছর ধরে। সপ্তাহে দুইবার, প্রতিবার সাড়ে তিন হাজার টাকার মতো লাগতো। দোকানের মাল বিক্রি করে দিলেন আব্বা। তারপর একদিন দোকানটাই বিক্রি করে দিলেন।
আম্মা তবু বাঁচলেন না।আম্মা মারা যাওয়ার পর আমাদের মাথার উপর রইলো তিন লাখ টাকার ঋণ আর তালতলার একটা ঘরে জং ধরা টিনশেড।
আমি ভেবেছিলাম আমার পড়াশুনার সেখানেই সমাপ্তি। স্কুল ছেড়ে কোনো গ্যারেজে বা দোকানে ঢুকতে হবে।ক্লাস সেভেনের শুরুতে আব্বা এক সন্ধ্যায় ঘরে এসে বললেন, চাকরি পাইছি।কোথায়?তোর স্কুলে। গেটে দাঁড়ায়া থাকার চাকরি।সেই রাতেই উনি আমাকে নিয়মটা বলে দিলেন।শোন রাকিব, স্কুলের ভিতরে তুই আমারে চিনবি না। আমিও তোরে চিনবো না।
কেন আব্বা?তুই ভালো ছাত্র। রোল এক-দুইয়ের বাইরে যাস না। এখন যদি সবাই জানে তুই দারোয়ানের পোলা, তাইলে তুই ফার্স্ট হইলে মানুষ কইবো স্যাররা দয়া কইরা নম্বর দিছে। আমি চাই না তোর নম্বর নিয়া কেউ একটা কথাও কইতে পারুক।বারো বছরের একটা ছেলের কাছে এই যুক্তি যতটা বোঝার কথা, আমি ততটাই বুঝেছিলাম। মানে কিছুই বুঝিনি।
আমার মনে হয়েছিলো, আব্বা আমাকে নিয়ে লজ্জা পান। দারোয়ানের ছেলে বলে স্কুলে আমার পরিচয় দিতে চান না।এই ভুলটা আমি চার বছর মনে পুষে রেখেছিলাম।দুই হাজার বাচ্চার একটা স্কুলে দারোয়ানের মুখ আর কোনো ছেলের ভর্তি ফরম কেউ মিলিয়ে দেখে না। আমাদের ধরা পড়ার কোনো সম্ভাবনাই ছিলো না।
সকালে আমি গেট দিয়ে ঢুকতাম। আব্বা রেজিস্টার হাতে দাঁড়িয়ে থাকতেন।আমি চোখ নামিয়ে হেঁটে যেতাম। উনিও তাকাতেন না।কিন্তু বাকি ছেলেরা তাকাতো। ওরা ওনাকে চাচা সম্বোধনে ডাকতো। দেরি হলে হাতে পায়ে ধরতে দ্বিধা করতো না। টিফিনের সময় হাতে খুচরা টাকা গুঁজে দিয়ে সিঙ্গাড়া সমুচা আনতে পাঠাতো। কারো কারো বাবা গাড়ি থেকে নেমে ওনার সাথে হাত মিলিয়ে যেতেন।
কেবল আমার সামনে টানানো ছিলো একটা অদৃশ্য দড়ি।ক্লাস নাইনে পড়ার সময় একদিন ছুটির পর ঝুম বৃষ্টি নামলো।আব্বা গেটের পাশে সবসময় একটা ছাতা রাখতেন। ক্লাস ফাইভের একটা বাচ্চা কাঁদতে কাঁদতে গেটে দাঁড়িয়ে ছিলো। আব্বা ছাতাটা ওর হাতে গুঁজে দিয়ে বললেন, নিয়া যা বাবা, কাইল আনিস মনে কইরা।
আমি তিন হাত দূরে দাঁড়িয়ে সবটা দেখলাম। তারপর বাসায় ফিরলাম কাকভেজা হয়ে।রাতে ঘরে ঢুকে দেখি আব্বা চুলায় পানি গরম করে রেখেছেন। একটা কথাও বললেন না।আমি ওই গরম পানিতে গোসল করলাম আর ভেতরে ভেতরে লোকটার প্রতি অভিমান বাড়তে লাগলো।
ক্লাস এইটে একদিন ফারহান নামের একটা ছেলে দেরি করে এসে গেটে আটকা পড়লো। আব্বা ঢুকতে দেননি, নিয়ম নাই বলে।ফারহান ক্লাসে ঢুকে আব্বার নকল করা শুরু করলো। স্যালুটের ভঙ্গিটা, ঘাড় শক্ত করে হাত কপালে তোলা।
পুরা ক্লাস হেসে গড়িয়ে পড়লো।আমিও উঠে দাঁড়িয়ে ওই স্যালুটটা একবার করে দেখালাম।হাসির শব্দটা তখন গেলো আরও বেড়ে।সেই রাতে আমি এক লোকমা ভাত মুখে তুলতে পারিনি। আব্বা জিজ্ঞেস করলেন, শরীর খারাপ?আমি বললাম, না।উনি কিছু দেখেছিলেন কি না, আমি আজও জানি না।
বাসায় আব্বা স্কুল নিয়ে একটা কথাও জিজ্ঞেস করতেন না। রোজ রাতে শুধু একটা গৎবাঁধা প্রশ্ন করতেন, পড়া হইছে?আমি দায়সারাগোছের উত্তর দিতাম, হইছে। ব্যস এটুকুই।আমার অভিমান বাড়তে থাকলো। মনে হতো, লোকটা আমার বাপ হয়েও বাপ না।
চার বছরে আব্বা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলেন। আমি ভাবতাম সারাদিন রোদে দাঁড়িয়ে থাকার ফল।এসএসসির ফরম ফিলাপের আগে সব বকেয়া ক্লিয়ার করতে হয়। আমি অ্যাকাউন্টসে গেলাম।সিরাজ ভাই খাতা খুলে আমার ফাইলটা বের করলেন। তারপর চশমার উপর দিয়ে আমার দিকে তাকালেন।তোমার আব্বা আশরাফ ভাই, না?আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেলো। কোনোমতে বললাম, ভাই, এইটা…
উনি হাত তুলে থামিয়ে দিলেন। আশ্বস্ত করবার কণ্ঠে বললেন, ভয়ের কিছু নাই। আমি চার বছর ধইরা জানি। বেতনের খাতাও আমি লেখি, ফি’র খাতাও আমি লেখি।তারপর বললেন, তোমার আব্বারে আমি কতোবার কইছি, স্টাফ কোটায় একটা দরখাস্ত দেন। স্টাফের পোলার পুরা বেতন মাফ। হেডস্যার এক কথায় সই করে দিতেন।
উনি রাজি হন নাই।আমি বললাম, মানে? সিরাজ ভাই উত্তর দিলেন খাতার পাতা উল্টাতে উল্টাতে।মানে চার বছরে তোমার পিছনে উনি বেতন, সেশন ফি, পরীক্ষার ফি বাবদ দিছেন লাখের কাছাকাছি টাকা। সাড়ে নয় হাজার টাকা বেতনের চাকরি কইরা।আমি ওইখানে দাঁড়িয়ে রইলাম।
চার বছরের শুকিয়ে যাওয়াটার মানে আমি ওইদিন বুঝলাম।অ্যাকাউন্টস থেকে বের হয়ে আমি করিডোরের থামে স্থির দাঁড়িয়ে রইলাম।মাঠের ওই পাশে গেটটা দেখা যাচ্ছিলো। আব্বা রেজিস্টার হাতে দাঁড়িয়ে আছেন, রোদে কুঁচকে আছে চোখজোড়া।চার বছরে আমি একবারও মানুষটার দিকে এতোক্ষণ ধরে তাকাইনি।তার দুই সপ্তাহ পর স্কুলে বিদায়ী অনুষ্ঠান হলো।মঞ্চে হেডস্যার, অতিথি, ফুলের তোড়া আরো কতো কি! সামনের সারিতে অভিভাবকরা বসা।শেষে ঘোষণা এলো, এই বছর যে ছেলেটা টেস্ট পরীক্ষায় প্রথম হয়েছে, তার অভিভাবককে একটা ক্রেস্ট দেওয়া হবে।মাইকে নাম বলা হলো, রাকিব হাসানের অভিভাবক জনাব আশরাফ আলী, মঞ্চে আসুন।হলঘরে কেউ উঠলো না।নামটা আবার বলা হলো। সামনের সারিতে গুঞ্জন শুরু হলো, লোকজন এদিকওদিক তাকাতে লাগলো।হেডস্যার আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, রাকিব, তোমার আব্বা আসেন নাই?আমি উঠে দাঁড়ালাম।চার বছর ধরে যে অদৃশ্য দড়িটা আমার সামনে টানানো ছিলো, আমি ওইটা ওইখানে ছিঁড়ে ফেললাম।বললাম, স্যার, আব্বা গেটে আছেন।হেডস্যার বুঝলেন না।
গেটে কেন? উনাকে ভিতরে ডেকে আনো।আমি বললাম, স্যার, আব্বা ডিউটিতে আছেন। উনি আমাদের স্কুলের দারোয়ান।হলঘরটা এমন চুপ হয়ে গেলো যে সিলিং ফ্যানের শব্দ শোনা যাচ্ছিলো।সামনের সারিতে ফারহান বসে ছিলো ওর বাবার পাশে। ছেলেটা আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো। মুখটা তার ততোক্ষণে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
হেডস্যার দপ্তরিকে পাঠালেন।দপ্তরি একা ফিরে এলো। বললো, স্যার, উনি আসতে চাইতেছেন না।তখন আমি নিজে হলঘর থেকে বের হয়ে করিডোর দিয়ে গেটের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম।আব্বা রেজিস্টার হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমাকে দেখে হাতটা নামিয়ে ফেললেন।মুখটা পাথরের মতো শক্ত।উনি বললেন, কাজটা তুই ভালা করলি না!
আমি বললাম, আব্বা…উনি আমার কথা শেষ করতে দিলেন না। হতাশাগ্রস্ত গলায় বললেন, কাইল থাইকা মানুষ কইবো, দারোয়ানের পোলা ফার্স্ট হইছে। চাইর বছর ধইরা আমি এই কথাটা ঠেকায়া রাখছি।মানুষটার গলা কাঁপছিলো। রাগে না, অন্য কোনো অব্যক্ত অনুভূতির জেরে।আমি জিজ্ঞেস করলাম, আব্বা, স্টাফ কোটার দরখাস্তটা দেন নাই কেন?উনি চুপ মেরে গেলেন।অনেকক্ষণ কোনো কথা বললেন না। রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলেন গভীর মনোযোগে। যেন সেখানে বিস্ময়কর কোনো ঘটনা ঘটছে!
তারপর গলা নামিয়ে বললেন, দরখাস্ত দিলে তো কাগজে লেখা লাগতো, তুই আমার পোলা।আমি ওইখানেই বুঝে গেলাম, লোকটার আসলে কোনো উপায় ছিলো না।
মাফ চাওয়ার কোনো রাস্তা ছিলো না বলে নিজেকে সংবরণ করলাম। বাপের কাছে মাফ চাইতে গেলে বাপ লজ্জা পায়।ক্রেস্টটা শেষ পর্যন্ত আব্বার নামেই ঘোষণা করা হয়েছিলো। উনি মঞ্চে ওঠেননি। দপ্তরির হাতে দিয়ে দেওয়া হলো আর আব্বা ওইটা গেটের টেবিলের নিচে রেখে দিলেন।একটা কথা আমি ওনাকে আজও বলিনি। ক্লাস এইটে একদিন আমি ওনার স্যালুটটা ক্লাসের সামনে নকল করে দেখিয়েছিলাম।ওইটা বলার সাহস আমার কোনোদিন হবে বলে মনে হয় না।
এসএসসির শেষ পরীক্ষার দিন আমি গেট দিয়ে বের হলাম।আব্বা তখনো ডিউটিতে। আমাকে দেখলেন ঝাপসা চোখে।তারপর হাত বাড়িয়ে আমার কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে নিজের কাঁধে ঝুলিয়ে নিলেন।চার বছর ধরে উনি ওই গেটে দাঁড়িয়ে শত শত বাপের হাতে ছেলের ব্যাগ উঠতে দেখেছেন।ওইদিন প্রথম নিজের ছেলেরটা তুললেন।

