বিজ্ঞানের উৎকর্ষতা মানুষকে যেমন দিয়েছে বেগ, তেমনি কেড়ে নিচ্ছে আবেগ-এমন একটি কথা প্রচলিত
রয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, বিজ্ঞানের একটি আবিষ্কার মানুষের কাজকে সহজ করার পাশাপাশি আবেগ, অনুভূতি, নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা ও মেধার বিকাশের অন্তরায় হয়ে উঠে। তবে বিজ্ঞানের আবিষ্কারকে অস্বীকার করা যায় না, যাবে না। এর যথাযথ ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে উপকার পাওয়ার পাশাপাশি অপব্যবহার সম্পর্কেও সচেতন থাকা জরুরি। তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে একেকটি অভূতপূর্ব উদ্ভাবন বা ইন্টারনেট টুলস মানুষের সামনে বিস্ময় নিয়ে হাজির হচ্ছে। এর পেছনে মানুষ বুঝে হোক, না বুঝে হোক, ছুটছে। এর ভালো ব্যবহার যেমন করছে, তেমনি খারাপ ব্যবহারও করছে। বর্তমান প্রযুক্তির মধ্যে আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই এক বিস্ময়কর উদ্ভাবনী টুলস। এর মাধ্যমে এমন কোনো কিছু নেই, যা করা যাচ্ছে না। এমন কোনো অজানা তথ্য নেই, যা মুহূর্তে জানা যাচ্ছে না। শুধু তাকে বললেই হয়, আমি এই বিষয়ে জানতে চাই। এতটুকু কমান্ড দিলেই মুহূর্তে সে তা চোখের সামনে হাজির করে দিচ্ছে। কেউ যদি মনে করে, সে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, গান, নিবন্ধ-প্রবন্ধ ইত্যাদি লিখবে, তাহলে সেগুলোর ধরন বলে দিলেই সে মুহূর্তে তা তৈরি করে দিচ্ছে। এমনকি মুহূর্তে একটি গানও গেয়ে দিচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্রেও এআই ব্যবহার করে শত্রুপক্ষকে ঘায়েল করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা থেকে শুরু করে, বিভিন্ন কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রকৌশল, শিল্পকারখানা, সেবামূলক ও উৎপাদন খাত এখন এআই প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে। অদূর ভবিষ্যতে এসব খাতে জনবল কমে কর্মসংস্থানের সংকট দেখা দেয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। শুধু প্রয়োজনীয় এআই বিশেষজ্ঞ থাকলেই এসব খাতের জন্য যথেষ্ট হয়ে যাবে।
প্রখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং বলেছেন, প্রযুক্তির উদ্ভাবন এক সময় মানবসভ্যতাকে ধ্বংস করে দেবে। তার এই কথা এখন প্রযুক্তিবিদদের অনেকেই উচ্চারণ করছেন। সম্প্রতি শীর্ষস্থানীয় এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক ও গুগল ডিপমাইন্ডের কিছু গবেষক এই বলে পদত্যাগ করেছেন যে, এআই একসময় মানুষের নিয়ন্ত্রণ ছাড়িয়ে নিজ থেকেই শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে, যা মানবজাতির জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠবে। অ্যানথ্রপিকের গবেষক জ্যাকব কক্সন আতঙ্কিত হয়ে বলেছেন, আমরা যদি এখনই এআই-এর অগ্রগতির রাশ টেনে ধরতে না পারি, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে আমরা সবাই মারা যেতে পারি। অ্যানথ্রোপিকের প্রধান দারিও আমোদেই এআই-এর অগ্রগতি ধীর করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রযুক্তির উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন নেই। তবে এর সঙ্গে যে ঝুঁকি রয়েছে, তা গুরুতর। আমোদেই শঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, অসংখ্য স্বয়ংক্রিয় প্রোগ্রাম (বট) একজোট হয়ে একটি শক্তিশালী সুপার কম্পিউটারের মতো রূপ নিতে পারে এবং পুরো ইন্টারনেট দখল করে নিতে পারে। গবেষক কক্সন মনে করেন, আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যেই এমন ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি হওয়া বিচিত্র কিছু নয়। তবে তিনি বলেছেন, এআই প্রযুক্তির বিপুল সুফলের পাশাপাশি যে নজিরবিহীন কিছু ঝুঁকি রয়েছে, তা দূর করতে আমরা পুরো এআই শিল্পের মধ্যে শক্তিশালী নিরাপত্তা ব্যবস্থার নতুন মডেল তৈরি করছি। এআই নিয়ে এসব শঙ্কার কথা স্বীকার করে ওপেন এআই-এর প্রধান স্যাম অল্টম্যান ও এক্স এআইয়ের প্রধান ইলন মাস্ক বলেছেন, এআই শিল্পের কাজের গতি কমাতে কঠোর নিয়মনীতি চালু এবং এআই মডেল ডেভেলপমেন্টের ওপর স্বাধীন তদারকি করা দরকার। যারা এআইয়ের উদ্ভাবক বা গবেষক, তারাই যখন এআই নিয়ে এই ভয়াবহ শঙ্কার কথা বলেন, তখন অন্যকোনো ব্যাখ্যা চলে না। এআই এখন সাধারণ মানুষের হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। যাদের প্রযুক্তির ন্যূনতম জ্ঞান রয়েছে, তারা যেমন এর ভালো ব্যবহার করছে, তেমনি মন্দ ব্যবহারও করছে। অনেকে ডিপফেক তথ্য, ভুয়া ছবি ও ভিডিও তৈরির মাধ্যমে প্রতারণা এবং অপপ্রচার করছে। ইতোমধ্যে প্রতিহিংসার বশে কিংবা পারিবারিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া তথ্য, ছবি, ফটোকার্ড ও ভিডিও প্রকাশ করতে দেখা গেছে। এর মাধ্যমে ভুয়া ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারও তৈরি হতে পারে। কারণ, এআই ব্যবহার করে সহজে তারা রোগের প্রেসক্রিপশন বা কোনো স্থাপনার ডিজাইন বের করে ফেলতে পারবে, যাতে প্রকৃত ডায়াগনসিস বা অভিজ্ঞতা বলতে কিছু থাকবে না। উদ্বেগের বিষয় হলো, এর মাধ্যমে মানুষের ব্যক্তিগত ডেটার গোপনীয়তা থাকছে না। সম্প্রতি সাইবার অপরাধীরা অর্থের বিনিময়ে এক মন্ত্রী ও কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বিগত তিন মাসে কার সাথে কি কথা বলেছেন, কোথায় অবস্থান করছিলেন ইত্যাদি প্রকাশ করে দিয়েছে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এআই বড় ধরনে ঝুঁকি তৈরি করেছে। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম বৃহৎ খাত জনশক্তি রপ্তানিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। মধ্যপ্রাচ্যসহ যেসব দেশ আমাদের জনশক্তি রফতানির প্রধান উৎস, সেসব দেশ ক্রমে এআইনির্ভর যন্ত্রপাতি বা অটোমেশনের দিকে ঝুঁকছে। এতে অদূর ভবিষ্যতে জনশক্তি রফতানি কমে যেতে পারে। এআই-এর দ্রুত অগ্রগতি নিয়ে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোও উদ্বেগ প্রকাশ করছে। এর প্রতিকার নিয়ে কথা বলছে। আবার পরাশক্তিগুলো সামরিক বাহিনীর যুদ্ধকৌশলে এআই ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল বা তথ্য সংগ্রহের দিকে ঝুঁকেছে। গত ৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত চীনের প্রভাবশালী দৈনিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এআই ব্যবহার করে বিশ্বে আধিপত্য বিস্তারে যুক্তরাষ্ট্রের যে আকাক্সক্ষা, তা চীন হতে দেবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। সেন্টার ফর চীনা অ্যান্ড গ্লোবালাইজেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এআই-এর খারাপ ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্বে আধিপত্য বিস্তার করার লক্ষ্য নিয়ে এগুচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে এআই-এর ব্যবহার বাড়ছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাসায়নিক প্রকৌশলীর এক গবেষক দল এআই ব্যবহার করে ‘ফাজ’ নামে নতুন ভাইরাস তৈরি করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না করায় নতুন এই ভাইরাস তৈরি করা হয়েছে। তবে বিজ্ঞানীরা শুরু থেকেই এর ব্যবহারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিজ্ঞানের আবিস্কার ও প্রযুক্তির উদ্ভাবন সভ্যতার বিকাশ ও মানুষের কল্যাণের জন্যই করা হয়। তবে এর ভালো-মন্দ নির্ভর করে মানুষের মানসিকতা ও তার ব্যবহারের ওপর। এআই-এর উদ্ভাবন মানুষের কাজকে সহজ করার জন্যই করা হয়েছে। তবে এর এমন কিছু ব্যবহার রয়েছে, যা মানুষের মেধা, মনন ও চিন্তা শক্তির বিকাশের অন্তরায় হয়ে উঠেছে। লেখালেখির ক্ষেত্রে যে চিন্তা, কল্পনা, সৃষ্টিশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক মানসিকতা বা মাথাঘামানোর প্রয়োজন, তা এআই ধ্বংস করে দিচ্ছে। তাকে কমান্ড দিলেই বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে একটি লেখা দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। এতে মানুষের চিন্তা বা মেধা কাজে লাগছে না। তবে এটাও ঠিক, এআই এসব তথ্য সংগ্রহ করে অনলাইন ও পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত লেখা থেকে। সেগুলো কেউ না কেউ মাথা খাটিয়ে লিখছে। যেকোনো নতুন আবিস্কারের যথাযথ ও নৈতিক-অনৈতিক ব্যবহার সম্পর্কে জানা আবশ্যক। আগুনের উপকারিতা-অপকারিতা জানার মতো এর ব্যবহার জানতে হবে। এআই নিয়ে যে উদ্বেগ, তা এর নেতিবাচক ব্যবহারের শঙ্কা থেকে তৈরি হয়েছে। এটি এমনই এক স্পর্শকাতর টুলস, যার যথাযথ ও নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারলে, উপকারের চেয়ে অপকার বেশি হবে। ইতোমধ্যে এর ভয়াবহতা সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন। তাই বলে এর ব্যবহার বন্ধ করা যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন এর সতর্ক ও সুচিন্তিত ব্যবহার। দেশে এআই-এর সঠিক ব্যবহারের চেয়ে ক্ষতিকর ব্যবহার যাতে না বাড়ে এ ব্যাপারে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য। এর ব্যবহারের সীমা ও আইনগত সুরক্ষা দরকার। সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে।

