“বড় ইচ্ছে করছে ডাকতে, তার গন্ধ মেখে থাকতে”
গানটা বাসের ভেতর হঠাৎ বেজে উঠতেই পেছন থেকে একজন চেঁচিয়ে উঠল,
“ভাই, গানটা বন্ধ করেন।”
ড্রাইভার যেন শুনেও শুনলেন না।
গানটা আরও জোরে বাজতে লাগল।
“বোঝে না, সে বোঝে না।”
এবার পেছন থেকে একজন গালাগালি শুরু করল।
“হালার*পুত, গান বন্ধ কর।”
ড্রাইভার ঘাড় ঘুরিয়ে বললো,
“গানে কী সমস্যা?”
লোকটা বললো,
”সমস্যা আছে, তুই বন্ধ কর।”
আরেকজন এমন একটা গা*লি দিল যে পাশের দুজন যাত্রী হেসে ফেলল। ড্রাইভার আর কথা বাড়াল না। সঙ্গে সঙ্গে গান বন্ধ করে দিল। বাসের ভেতর আবার আগের শব্দ ফিরে এল, ইঞ্জিনের গর্জন, মানুষের কথাবার্তা, জানালার কাঁচে বাতাসের শব্দ।
আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম দরজার একটু ভেতরে। বিশমাইল থেকে উঠেছি। শ্যামলী যাব। সিট পাইনি। আমার পাশে একজন লোক দাঁড়িয়ে ছিলেন। বয়স পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন হবে। গায়ে হালকা বাদামি রঙের শার্ট, কালো প্যান্ট। হাতে কালো কাপড়ের একটা ব্যাগ। লোকটা কিছুক্ষণ চুপচাপ ছিলেন।
তারপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন,
“হেমায়েতপুর নামবেন?
আমি বললাম,
“না।”
“কোথায়?”
“শ্যামলী।”
তিনি মাথা নেড়ে বললেন,
“আচ্ছা।”
বাস তখন জাহাঙ্গীরনগর পার হয়ে রেডিও কলোনির দিকে যাচ্ছে। আমি জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলাম।
কিছুক্ষণ পর লোকটা আবার বললেন,
“ফোন কোন পকেটে রাখেন?”
আমি তাঁর দিকে তাকালাম। প্রশ্নটা একটু অদ্ভুত। তবু অস্বাভাবিক কিছু মনে হলো না।
বললাম,
“ডান পকেটে।”
তিনি বললেন,
“সামনেরটা?”
“জি।”
“পেছনের পকেটে রাখেন না?”
“না।”
তিনি মাথা নেড়ে চুপ করে গেলেন।
আমি ভাবলাম, হয়তো নিজের কোনো কারণে জিজ্ঞেস করছেন। বাসে অপরিচিত মানুষ কখনো কখনো অদ্ভুত প্রশ্ন করে। সব প্রশ্নের পেছনে রহস্য থাকে না।
কিছুক্ষণ পর তিনি বললেন,
“আপনার ফোনটা নতুন?”
“না।”
“কতদিন?”
“একবছর।”
“ভালো চলে?”
“চলে।”
“চার্জ থাকে?”
আমি এবার একটু হেসে বললাম,
“আপনি ফোন কিনবেন?”
লোকটাও হালকা হাসলেন।
“না, এমনি জিজ্ঞেস করলাম।”
বাস সাভার পার হলো।
পেছনের দিকে কেউ একজন তখনও ড্রাইভারকে নিয়ে হাসাহাসি করছিল।
“শা*লা মনে হয় কলকাতার ঐ সিনেমাটা দেখে নাই।”
আরেকজন বললো,
“সিনেমাটা দেখলে জানতো এই গান ছাড়লে বাস এক্সিডেন্ট হয়।”
লোকটা তখন আমার পাশে দাঁড়িয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন।
হঠাৎ বললেন,
“মানুষ একটা জিনিস ভুল করে।”
আমি তাকালাম।
“কী?”
তিনি বললেন,
“এই যে অহেতুক হাসাহাসি করে।”
আমি বললাম,
“হাসাহাসি করলে কী হয়?”
তিনি বললেন,
“হাসাহাসির কারণটা সত্যি হয়ে যায়।”
আমি কথাটার মানে বুঝলাম না। তবে জিজ্ঞেসও করলাম না। তিনি নিজেও আর কিছু বললেন না। হেমায়েতপুরের কাছাকাছি এসে বাস ধীর হলো। লোকটা তাঁর ব্যাগটা একটু শক্ত করে ধরলেন।
তারপর বললেন,
“আমি নামব।”
আমি সরে দাঁড়ালাম। বাস থামল। নামার আগে লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে একবার মুচকি হাসলেন। তারপর নেমে গেলেন।
বাস আবার চলতে শুরু করল।
দুই-তিন মিনিট পর পেছন থেকে হঠাৎ চিৎকার।
“আমার ফোন কই? আমার ফোন কই?”
সবাই ঘুরে তাকাল।
একজন লোক নিজের দুই পকেট হাতড়াচ্ছেন।
“এই তো ছিল!”
তার পাশের লোক বলল,
“ভালো করে দেখেন।”
“দেখছি তো! নাই!”
আরেকজন বলল,
“আপনার পাশে কে ছিল?”
“একজন লোক ছিল। একটু আগে নামছে।”
পেছন থেকে সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন বলল,
“একজন না ভাই। এরা দল বেঁধে কাজ করে।”
আরেকজন বলল,
“হ, একজন নামছে মানে আরেকজন বাসেই আছে।”
ড্রাইভার চেঁচিয়ে উঠল,
“গেট লাগা! গেট লাগা!”
হেলপার গেট লাগিয়ে দিলো।
বাসের ভেতর মুহূর্তের মধ্যে পরিবেশ বদলে গেল। কিছুক্ষণ আগেও যারা গান নিয়ে হাসছিল, তারা এখন একে অপরের পকেট দেখছে।
একজন বলল,
“সবাই যার যার জায়গায় থাকেন।”
হেলপার বলল,
“সবাইরে চেক করা হইবো।”
চেক করা শুরু হলো।
সবাইকে চেক করে আমার কাছে আসা মাত্রই আমি দুই হাত উপরে তুলে বললাম,
“চেক করেন।”
আমার বাম পকেট থেকে রুমাল বের হলো। পেছনের পকেট খালি। ডান পকেটে হাত ঢোকাতেই একটা শক্ত জিনিস ঠেকল। আমি থেমে গেলাম। আমি জানতাম, সেখানে আমার ফোন নেই। আমার ফোনটা তখনও আমার বাম হাতেই ধরা।
জিনিসটা বের করা হল। একটা কালো মোবাইল। বাসের ভেতর কয়েক সেকেন্ডের জন্য এমন নীরবতা নেমে এল, যেন সবাই একসঙ্গে নিঃশ্বাস বন্ধ করেছে। ফোন হারানো লোকটা ছুটে এসে আমার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিল।
“এইটাই আমার!”
আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম। তার আগেই একটা চড় এসে গালে পড়ল। তারপর আরেকটা।
আমি শুধু বললাম,
“আমি নিই নাই।”
কেউ শুনল না।
হেলপার গেট খুলে আমাকে ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দিল। আমি রাস্তার একপাশে ছিটকে পড়ে পায়ে ব্যথা পেলাম। উঠে দাঁড়াতে একটু সময় লাগল। তাকিয়ে দেখি, সামনেই আমিন বাজার ব্রিজ। বাসটা তখন ব্রিজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমি অনেকক্ষণ বাসটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। নিজেকে খুব অসহায় লাগছিল।
তারপর হঠাৎ-
একটা বিকট শব্দ।
শব্দটা এত তীব্র ছিল যে বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
আমি ব্রিজের দিকে তাকালাম।
বাসটা নেই।
ব্রিজের রেলিং ভেঙে নিচে পড়ে গেছে।
আমিনবাজার ব্রিজের এই দুর্ঘটনার খবর যারা পত্রিকায় পড়েছিলেন, তারা আহত ও নিহতের সংখ্যা জানেন। কিন্তু একটা জিনিস জানেন না-
দুর্ঘটনার প্রায় বিশ মিনিট আগে একজন লোক হেমায়েতপুরে নেমে গিয়েছিলেন। নামবার আগমুহূর্তে তিনি আমার পকেটে ফোনটা রেখেছিলেন। সেটা আমাকে চোর বানানোর জন্য? নাকি বাস থেকে নামানোর জন্য? এর উত্তর আমি কোনোদিন পাইনি!
- BM Rayhan

