গল্পের শুরু ২০০৫ সালের আগস্টে। মাত্র ১৮ বছর বয়সে জাতীয় দলের জার্সিতে অভিষেক। এরপর দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে ২১ বছর। এই দীর্ঘ সময়ে বদলে গেছে ফুটবলের অনেক কিছু, এসেছে নতুন প্রজন্ম, বদলেছে আর্জেন্টিনার দলও। কিন্তু মেসির উপস্থিতি থেকে গেছে একই রকম আলোচিত। যদিও জাতীয় দলের সঙ্গে তার পথচলা কখনোই মসৃণ ছিল না।
২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে হার। এরপর ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরপর হতাশা। ২০১৬ সালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হারের পর আরেকটি ফাইনাল হার মেসিকে এতটাই ভেঙে দিয়েছিল যে, আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন তিনি। তখন অনেকেই মনে করেছে, আর্জেন্টিনার জার্সিতে হয়তো এখানেই শেষ মেসির গল্প। কিন্তু শেষটা তখনও শেষ হয়নি।

জাতীয় দলে ফিরে এসে মেসি যেন নিজের গল্পটাকেই নতুন করে লিখলেন। ২০২১ সালে ব্রাজিলের মাটিতে তাদের হারিয়ে কোপা আমেরিকা জয়। পরের বছর ইতালিকে হারিয়ে ফিনালিসিমা। এরপর কাতার বিশ্বকাপ, ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই অবিশ্বাস্য ফাইনাল। মেসির জোড়া গোল, টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার জয় এবং ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান।
যে মেসিকে একসময় জাতীয় দলের হয়ে শিরোপা জিততে না পারার জন্য সমালোচিত হতে হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই তিনিই বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে দাঁড়ালেন। এরপরও থামেননি মেসি। ২০২৪ সালে আরেকটি কোপা আমেরিকা জয় তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে এনে দেয় আরও এক শিরোপা। ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসেও তার নাম স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেয়।
রেকর্ডের পাতাতেও মেসির নাম যেন অবিচ্ছেদ্য। ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া, বিশ্বকাপে ৩৪ ম্যাচ খেলা, তিনটি ফাইনালে কাপ্তানের আর্মব্যান্ড নিয়ে উপস্থিত থাকা, সবই তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সাক্ষ্য। ২০২৬ বিশ্বকাপেও রেকর্ডের পাতায় নিজের অবস্থান আরও সমৃদ্ধ করেছেন তিনি। বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১-এ।

শুধু গোল নয়, অ্যাসিস্টেও অনন্য মেসি। বিশ্বকাপের পাঁচটি ভিন্ন আসরে অ্যাসিস্ট করা একমাত্র খেলোয়াড় ক্ষুদে জাদুকর। নকআউট পর্বে তার অ্যাসিস্ট ছয়টি, যেখানে পেলের সঙ্গে তিনি যৌথভাবে শীর্ষে। একটি বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে ফাইনাল পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই গোল করার বিরল কীর্তিও আছে লিটল ম্যাজিশিয়ানের।
আর্জেন্টিনার হয়েও সংখ্যাগুলো কম বিস্ময়কর নয়। ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল, জাতীয় দলের জার্সিতে মেসির দীর্ঘ যাত্রার প্রতিচ্ছবি। ৬ অক্টোবর বেনিনের বিপক্ষে মাঠে নামলে আন্তর্জাতিক ম্যাচের সংখ্যা পৌঁছাবে ২০৮-এ। ক্লাব ফুটবলেও তাঁর রেকর্ডের শেষ নেই। বার্সেলোনার হয়ে লা লিগায় ৪৭৪ গোল, এক মৌসুমে ৫০ গোল, আটটি পিচিচি ট্রফি, ছয়টি ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু এবং আটটি ব্যালন ডি’অর, সব মিলিয়ে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বর্ণিল ক্যারিয়ার এই মহাতারকার।
তবে মেসির গল্পকে শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝা কঠিন। এটি একজন ফুটবলারের গল্প, যিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন বিশ্বকাপ জয়ের। যিনি ফাইনালে হেরেছেন, সমালোচনা শুনেছেন, কেঁদেছেন, একবার অবসরের ঘোষণাও দিয়েছেন। কিন্তু আবার ফিরেছেন। আর শেষ পর্যন্ত ছুঁয়েছেন সেই স্বপ্ন, যেটি তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা হয়ে উঠেছিল।
আগামীকাল সেই গল্পের শেষ মঞ্চে নামবেন মেসি। মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামের গ্যালারি ভরে উঠবে আকাশি-সাদায়। পাশে থাকবেন সতীর্থরা, গ্যালারিতে থাকবে পরিবারের সদস্য ও অগণিত সমর্থক। যারা তার হতাশার রাত দেখেছেন, তার কান্নার সাক্ষী হয়েছেন, আবার বিশ্বকাপ জয়ের রাতে রাস্তায় আনন্দে উল্লাসে মেতেছেন। বেনিনের বিপক্ষে শেষ বাঁশি বাজার পর হয়তো আর কোনো নতুন অধ্যায় শুরু হবে না। থাকবে শুধু স্মৃতি। একটি ১০ নম্বর জার্সি। একটি বাঁ পা। একটি ফুটবল। একটি দেশ। আর একজন লিওনেল মেসি।
২০০৫ সালে যে কিশোর আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে প্রথমবার মাঠে নেমেছিলেন, ২১ বছর পর সেই জার্সিতেই শেষবারের মতো মাঠে নামবেন একজন কিংবদন্তি। শুরুটা হয়েছিল স্বপ্ন দিয়ে। শেষটা হচ্ছে পূর্ণতায়। ৬ অক্টোবর, মনুমেন্টাল স্টেডিয়াম। আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সিতে শেষবারের মতো লিওনেল মেসি। এটি শুধু একটি ম্যাচের শেষ নয়, আর্জেন্টিনার জার্সিতে একটি মহাকালের বিদায়।

