তিন বছর পর আবারও বৈঠকে বসেছে বাংলাদেশ-ভারত জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ অন ট্রেড (জেডব্লিউজি)। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী এই বৈঠক।বৈঠকে বাংলাদেশের পাটপণ্যে ভারতের নতুন শুল্ক, আমদানি-রপ্তানিতে বিধিনিষেধ, স্থলবন্দরের প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (এফটিএ) আয়েশা আক্তারের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের বাংলাদেশি প্রতিনিধিদল বৈঠকে অংশ নিয়েছে।গতকাল বুধবার প্রতিনিধিদলটি নয়াদিল্লি পৌছেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বৈঠকে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি, শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমানো, স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য পরিবহন সহজ করা এবং দুই দেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে আলোচনা হবে।
পাটপণ্যে ভারতের নতুন শুল্ক
এবারের বৈঠকে বাংলাদেশের পাটপণ্যে ভারতের নতুন অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্কের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি করা জুট ইয়ার্ন বা টুইন, হেসিয়ান ফ্যাব্রিক ও জুট স্যাকিং ব্যাগের ওপর ভারতের বিদ্যমান শুল্ক কাঠামো পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।এর পাশাপাশি বাংলাদেশে ভারতীয় সুতা আমদানির ক্ষেত্রে আরোপিত বিধিনিষেধ নিয়েও আলোচনা হতে পারে। ব্যবসায়ীরা যাতে দুই দেশের বাজারে আরও সহজে পণ্য প্রবেশ করাতে পারেন, সে জন্য বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা কমানোর বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পাবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে দুই দেশের বাণিজ্য ব্যবধানের কারণে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশের আমদানি প্রায় ১০ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। বিপরীতে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি প্রায় ৯ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার।
এই ঘাটতি কমাতে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ানোর সুযোগ সম্প্রসারণ, শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর করা এবং স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য পরিবহন সহজ করার ওপর বাংলাদেশ জোর দিতে পারে।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি ৩৩৫ দশমিক ২ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় এই রপ্তানি ৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ বেশি।স্থলবন্দর ও পণ্য সরবরাহ
বৈঠকে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো, স্থলবন্দরগুলোর অবকাঠামো ও সক্ষমতা উন্নয়ন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের বিষয়ও আলোচনায় আসতে পারে।
এর আগে ২০২৩ সালের ২৬ ও ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত ১৫তম জেডব্লিউজি বৈঠকেও বন্দর-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ প্রত্যাহার, পণ্য সরবরাহ, পণ্যের মান নির্ধারণ ও পারস্পরিক স্বীকৃতি এবং সড়ক ও রেল যোগাযোগের বিষয় গুরুত্ব পেয়েছিল।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, দুই দেশের বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়েই বৈঠকে আলোচনা হবে। বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, আমদানি-রপ্তানির প্রতিবন্ধকতা দূর করা এবং পারস্পরিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের পথ খুঁজে বের করাই বাংলাদেশের অন্যতম লক্ষ্য।
সেপা নিয়ে নতুন আলোচনা
তিন বছর পর জেডব্লিউজি বৈঠক হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ অ্যাগ্রিমেন্ট (সেপা) নিয়েও নতুন করে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
২০২৩ সালের বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভারত সেপা চালুর প্রাথমিক প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনা করেছিল। এবার সেই আলোচনা কতটা এগিয়ে নেওয়া যায়, সেটিও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের বাস্তবতায় ভারত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। শিল্পের কাঁচামাল, তুলা, সুতা, খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের ভারতের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। একই সঙ্গে ভারতের বাজারও বাংলাদেশের রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তাই বাণিজ্য সম্পর্ককে প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়া এবং শুল্ক ও অশুল্ক বাধা কমানোর উদ্যোগকে এবারের জেডব্লিউজি বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

