আর্থিক সংকটে পড়ে জরুরি প্রয়োজনে নেওয়া সামান্য ঋণই এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে রংপুরের পীরগঞ্জের প্রায় ৫০ জন শিক্ষকসহ শতাধিক পরিবারের। ঋণের জামানত হিসেবে দেওয়া ফাঁকা চেক ও সাদা স্ট্যাম্পকে হাতিয়ার বানিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, চড়া সুদ দাবিসহ নিঃস্ব করার জঘন্য চক্র গড়ে তুলেছেন চতরা ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা জিয়াউর রহমান জিয়া। রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব খাটিয়ে চেকে ইচ্ছামতো টাকার অঙ্ক বসিয়ে মিথ্যা মামলা, জমি দখল এবং ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগে এখন চরম আতঙ্ক ও আতান্তরে দিন কাটাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ব্যাংক হিসাবের ফাঁকা চেকে স্বাক্ষর এবং টিপসই করা সাদা স্ট্যাম্প রেখে ঋণ দিতেন জিয়াউর রহমান। ঋণের মূল টাকা ও সুদ পরিশোধের পর এসব কাগজপত্র ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন অজুহাতে তা আটকে রাখা হতো। পরে ওই ফাঁকা চেকে ঋণের প্রকৃত অঙ্কের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকা লিখে ব্যাংকে জমা দেওয়া এবং চেক ডিজঅনার করিয়ে আদালতে মামলা করার অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, মামলা ও গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে পরে তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় কিংবা জমি-সম্পত্তি লিখে নেওয়ার চাপ সৃষ্টি করা হতো।
চতরা উচ্চ বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক প্রয়াত সতীশ চন্দ্র সংসারে আর্থিক সংকটের সময় জিয়াউর রহমানের কাছ থেকে ৪ লাখ ২২ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। এর বিপরীতে তিনি একটি ফাঁকা ব্যাংক চেক জামানত হিসেবে দেন। স্বজনদের ভাষ্য, চার বছরে সুদে-আসলে প্রায় ছয় লাখ টাকা পরিশোধ করার পরও তার হিসাব সমন্বয় করা হয়নি। বরং সুদের বকেয়া দেখিয়ে তাকে ২০ শতক জমি লিখে দিতে বাধ্য করা হয়। প্রায় দুই বছর আগে সতীশ চন্দ্র মারা যান।
একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে বড় আলমপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মাহফুজার রহমানের ক্ষেত্রেও। তিনি ২ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ফাঁকা চেক ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছিলেন। পরে তার অজান্তে সোনালী ব্যাংকের চতরা শাখা থেকে ৭ লাখ টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে।
ওই বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মকবুল হোসেনের অভিযোগ, ২ লাখ টাকা ঋণের বিপরীতে তিনি ৮ লাখ টাকা পরিশোধ করেছেন। তারপরও তার দেনা শেষ হয়নি। বরং তার, তার ছেলে এবং দুই ভাইয়ের নামে পৃথক চেক ডিজঅনার মামলা করা হয়। এসব মামলায় একটি চেকে ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং সব মিলিয়ে প্রায় ৪০ লাখ টাকার মামলা দেওয়ার অভিযোগ করেছেন তিনি।
ভুক্তভোগীদের মধ্যে সরলিয়া টিএম ফাজিল মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক গোলাম রব্বানীর অভিজ্ঞতা আরও গুরুতর। তার ভাষ্য, তিন লাখ টাকা ঋণের বিপরীতে তিনি ৪ লাখ টাকা সুদ পরিশোধ করেছেন। এরপরও তার নামে ১৪ লাখ ৫০ হাজার টাকার মামলা করা হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে ব্যাংক থেকে জোর করে তুলে নিয়ে জিয়ার নিজ দোকানে রাখা এবং সেখানে শারীরিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগ করেন তিনি। এ ঘটনায় বিচার চেয়ে আদালতে মামলাও করেছেন গোলাম রব্বানী।আরেক ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ, ঋণের টাকা ও সুদ পরিশোধ করার পরও তারা রেহাই পাননি। জমা রাখা ফাঁকা চেকে ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা বসিয়ে মামলা করা হয়। পরে মামলা থেকে বাঁচতে পরিবারটি স্থানীয়ভাবে আরও ২ লাখ টাকা দিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করতে বাধ্য হয়।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে জিয়াউর রহমান জিয়ার সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি সুদের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে ক্যামেরার সামনে কিংবা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য দিতে তিনি রাজি হননি। একপর্যায়ে সংবাদ সংগ্রহের সময় তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিবেদকের ক্যামেরা ও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন এবং প্রতিবেদকের ওপর চড়াও হন।
পীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজমুল হক বলেন, ‘সুদের ব্যবসা ও ফাঁকা চেক দিয়ে হয়রানির বিষয়ে ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্তসাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, ব্যক্তিগত ঋণ বা চেক জালিয়াতির মামলার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র নিয়ে ভুক্তভোগীরা এলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

