আকাশ ভরা পূর্ণিমা। বিশাল এক রুপালি চাঁদ উঠেছে আজ।
নদীর ধারের নরম ঘাসে গা এলিয়ে বসে আছে মা কাঠবিড়ালি, আর তার ছোট্ট ছানা বিন্তি খুশিতে এদিক-সেদিক ছুটে বেড়াচ্ছে।
বিন্তি কখনো ঘাসের ওপর ডিগবাজি খাচ্ছে, আবার কখনো দুহাত তুলে চাঁদের আলো মাখছে গায়ে। মেয়ের এই আনন্দ আর ছোটাছুটি দেখে মা কাঠবিড়ালি সারা দিনের সব ক্লান্তি ভুলে গেল। কিছুক্ষণ পর মা ডাকল, ‘বিন্তি, এবার এসো।
কোটরে গিয়ে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ি।’
বিন্তি গালটা ফুলিয়ে বলল, ‘উঁহু, যাব না। এখন কোটরে গেলে সকালে তো আর আমাকে বের হতে দেবে না। তুমি একাই খাবারের খোঁজে যাবে, আর আমি সারা দিন ওই ঘুটঘুটে অন্ধকার কোটরে বসে থাকব? তা হবে না, তা হবে না।
আমি আজ সারা রাত বাইরে খেলব।’
এই বলে বিন্তি লাফাতে লাফাতে চলে গেল একটু দূরে ঘাসের ওপর। ঠিক তখনই কাছের একটা ডাল থেকে হুতোম হুতোম শব্দ করে পেঁচা ডেকে উঠল। বিন্তি তো ভয়েই কাঁচুমাচু!
সে এক দৌড়ে সোজা ফিরে গেল মায়ের কাছে। মায়ের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘মা, আজ বরং কোটরেই যাই।
কাল না হয় সারা রাত জাগব, কেমন?’ মেয়ের কাণ্ড দেখে মা তো হেসেই কুটি কুটি। তারপর বিন্তিকে নিয়ে গাছের নিরাপদ কোটরে ঢুকে পড়ল।
মা কাঠবিড়ালি ভীষণ পরিশ্রমী ও সৎ। সে প্রতিদিন অনেক ঘুরে ঘুরে খাবার আনে। বাইরের ভয়ংকর সব বিপদ থেকে বাঁচাতে বিন্তিকে সে কোটরে লুকিয়ে রেখে যায়। কিন্তু বিন্তির এই বন্দিজীবন একদমই ভালো লাগে না।
তাদের গাছের পাশেই মানুষের একটা বিশাল বাগান। সেখানে আম, জাম, পেয়ারা আর সূর্যমুখী ফুলের মেলা। কিন্তু ওই বাগানে যাওয়া বিন্তির একদম নিষেধ। বাগানটা নাকি একটা মানুষের। কেন রে ভাই, বাগান একজনের হতে হবে কেন? সবার হলে কী ক্ষতি? বিন্তি ভেবে পায় না।
পাশের কোটরেই থাকে কোকু নামের আরেকটি কাঠবিড়ালি। খুব দুষ্টু সে। ওর মা যখন খাবার খুঁজতে যায়, কোকু তখন লুকিয়ে ওই বাগানে ঢুকে ফল চুরি করে খায়। আজ কোকু এসে বিন্তিকে বলল, ‘যাবি আমার সঙ্গে বাগানে? একটা বড় পেয়ারা পেকেছে। ইস! পেয়ারাটা খাওয়ার জন্য আমার আর তর সইছে না।’
বিন্তি জোরে জোরে মাথা নেড়ে বলল, ‘না রে বাবা, না। মা বলেছে, না বলে অন্যের জিনিস নেওয়া চুরি। তা ছাড়া বাইরে গেলে যদি বিপদ হয়?’ কোকু ফিক করে হেসে বলল, ‘চুরিবিদ্যা মহাবিদ্যা, যদি না পড়ো ধরা।’
কোকুর কথা শুনে বিন্তি আর পেয়ারার লোভ সামলাতে পারল না। জিভে পানি চলে এলো। সে সাবধানে এদিক-ওদিক তাকিয়ে কোকুর পেছন পেছন বাগানে ঢুকল। ভয়ে বুকটা ধুকপুক করলেও সে ধীরে ধীরে পেয়ারাগাছে উঠল।
কোকু পেয়ারার ডালটায় বসে মজা করে পেয়ারা খেতে লাগল। ‘আহ, কী মিষ্টি পাকা পেয়ারা! খাবি বিন্তি? আয় তাহলে এদিকে।’ বিন্তি গুটি গুটি পায়ে পেয়ারাটার দিকে এগোতে শুরু করল। ঠিক তখনই চারপাশটা কেমন যেন নিশ্চুপ হয়ে গেল। হঠাৎ পাকা পেয়ারাটার ওপর পড়ল বিশাল একটা কালো ছায়া। ঢেকে গেল রোদের আলো। বিন্তি আর কোকু অবাক হয়ে ওপরে তাকাতেই দেখল, বিশাল ডানা মেলে তাদের দিকে ধেয়ে আসছে দ্রুতগতির এক শিকারি চিল। তীক্ষ চি-চি-চিইইই শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠল।
চিলটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভয়ে বিন্তি আর কোকু গাছের ডাল থেকে সোজা নিচে পড়ে গেল। একটুর জন্য চিলের ধারালো নখ থেকে রক্ষা পেল।
বিন্তির ভাগ্য ভালো, সে গাছের নিচে জড়ো করে রাখা শুকনো পাতার নরম ঢিবির ওপর পড়ল। কিন্তু কোকু মগডাল থেকে পড়ল পাশের একদম শক্ত মাটির ওপর। পায়ে ভীষণ ব্যথা পেল। কুউ-কুউ করে কাঁদতে লাগল কোকু। টানা তিন মাস সে বাসা থেকে বেরোতেই পারল না।
একদিন বিন্তি আর তার মা কিছু মিষ্টি বাদাম নিয়ে কোকুকে দেখতে গেল। কোকু নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে। সে বিন্তির দিকে তাকিয়ে বলল,
‘চুরিবিদ্যা মহাবিদ্যা
ধরা যদি না পড়ো,
পড়লে ধরা কষ্ট অনেক
বিপদ হবে খুব বড়ো।’
বিন্তি মাথা নাড়িয়ে মুচকি হেসে বলল,
‘মায়ের কথা শুনতে হবে
আসবে না আর বিপদ তবে।’
কোকু আর বিন্তির কথা শুনে মা কাঠবিড়ালি তাদের মাথায় হাত বুলিয়ে বুকে টেনে নিল।

