বাংলাদেশ কখনোই হিমালয়ের পানির ওপর তার অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার সঠিক মূল্য হিসাব করেনি; নদীগুলোতে পানি প্রবাহ জোগানো হিমবাহ ও বরফ পর্যবেক্ষণ প্রায় করেই না বললেই চলে।
হিমালয়ের ওপর দেশের অর্থনীতি কতটা নির্ভর করে, তা হিসাব করে বের করেছে ভারত। ‘প্রস্পারাস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট হিমালয়াজ’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জিডিপির ২১.৫ শতাংশ (৬৪.৮ লাখ কোটি রুপি) সরাসরি হিমালয় ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ছিল।
প্রতিবেদনটি যৌথভাবে প্রস্তুত করেছে সিস্টেমিক, ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ইনিশিয়েটিভ, আইসিআইএমওডি (ইসিমোড) এবং ভারতের জিবি পান্ত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হিমালয়ান এনভায়রনমেন্ট।
এই আর্থিক মূল্যের সিংহভাগই অর্জিত হয়েছে গঙ্গা অববাহিকার দেশগুলোতে—বিশেষ করে সেচযুক্ত গম ক্ষেত, শিল্পাঞ্চল, পৌর গ্রিড এবং রাজ্য বিদ্যুৎ ব্যবস্থাগুলোতে।
একই নদীর আরও নিম্নে অবস্থান করা এবং সেগুলোর ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের কাছে এ ধরনের কোনো তথ্য নেই। তথ্যের অভাবে দেশ নিজের অর্থনীতির এই জলজ ভিত্তির গুরুত্ব সম্পর্কে অন্ধই রয়ে গেছে, যা তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি করছে।
বাংলাদেশ কখনোই হিমালয়ের পানির ওপর তার অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার সঠিক মূল্য হিসাব করেনি; নদীগুলোতে পানি প্রবাহ জোগানো হিমবাহ ও বরফ পর্যবেক্ষণ প্রায় করেই না বললেই চলে। এমনকি উজান বাঁধগুলোর রিয়েল-টাইম তথ্য থেকেও বাংলাদেশ বঞ্চিত, যা দিয়ে কোনো সংকট আসার আগেই সতর্ক হওয়া যেত।
এই তিনটি বিষয়ে অজ্ঞ থাকায় বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক ভিত্তি হিসাব করতে, পর্যবেক্ষণ করতে কিংবা আগাম পূর্বাভাস পেতে ব্যর্থ হচ্ছে।
এদিকে সময় দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছে: হাইড্রোলজিস্ট বা পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞরা চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ‘পিক ওয়াটার’ বা পানি প্রবাহের সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছানোর আশঙ্কা করছেন, যার পর থেকে শুষ্ক মৌসুমের পানি প্রবাহ চিরতরে কমতে শুরু করবে। আর আসন্ন এই সংকটের জন্য আমরা এখনও নিজেদের প্রস্তুত করতে পারিনি।
আইইউবিএটি-এর অর্থনীতির অধ্যাপক এবং ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের (ইসিমোড) সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ গোলাম রসুল বলেন, ‘ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের এক ধরনের বাধ্যগত অসহায়ত্ব তৈরি হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে হিমালয়ের হিমবাহ নিয়ে আমাদের সুনির্দিষ্ট কাজের সুযোগ খুব বেশি নেই। কারণ আমরা ভাটির দেশ। হিমালয় থেকে নেমে আসা পলি জমার মাধ্যমেই বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়েছে। সেই অর্থে আমরা হিমালয় ব্যবস্থারই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু যখন আমরা হিমবাহের কথা বলি, তখন প্রশ্ন ওঠে যে, পানি যখন আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, তখন তা কতটা প্রাসঙ্গিক?’
উজান দেশের বাঁধগুলো যখন শুষ্ক মৌসুমের পানি অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয়, তখন ভাটির নীতি নির্ধারকরা পানির পরিমাণকে একটি প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে দেখার বদলে কেবল একটি অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিবর্তনশীল উপাদান হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
গোলাম রসুল আরও বলেন, ‘এ কারণেই, যদিও হিমবাহের বরফ গলা পানি এবং হিমালয়ের বরফ অনেক সম্ভাব্য সুবিধা দেয়, কিন্তু এর ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আর উজান দেশে যখন একটি বড় ও শক্তিশালী দেশ থাকে, তখন তারা প্রায়শই নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিতে অনিচ্ছুক হয়। পানি শুধু পানিই নয়। পানিই জীবন, আবার সময়ে সময়ে পানি একটি অস্ত্রও হয়ে উঠতে পারে।’
তিনি জানান, প্রধান নদীগুলোর বার্ষিক পানি প্রবাহের প্রায় ৮০ শতাংশই আসে বর্ষার চার মাসে; তবে দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুমে হার্ডিঞ্জ ব্রিজে গঙ্গার মোট প্রবাহের আনুমানিক ৯-১০ শতাংশ এবং বাহাদুরবাদে ব্রহ্মপুত্রের ৩-৫ শতাংশ আসে হিমালয়ের বরফ ও হিমবাহ গলা পানি থেকে।
বছরের মোট পানির অনুপাতে এটি হয়তো ক্ষুদ্র একটি সংখ্যা। তবে যখন পানি একেবারেই থাকে না, তখনকার লভ্য পানির অনুপাতে এই সামান্য পরিমাণই পর্যাপ্ত ফসল পাওয়া বা ফসলহানির মধ্যবর্তী মূল পার্থক্য গড়ে দেয়।
হিসাব করতে কী প্রয়োজন
এশিয়া সায়েন্স মিশনের পরিচালক এবং টেকসই পানি ভবিষ্যৎ কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক অনিক ভাদুরী বলেন, ‘পুরনো ও স্থির মডেলগুলোর উর্ধ্বে উঠে কাজ করলে পারস্পরিক সহযোগিতা না করার ক্ষতি এবং অংশীদারিত্বের পানির মূল্য অবশ্যই নির্ধারণ করা সম্ভব।’
ভাদুরী সতর্ক করে বলেন, ‘বাংলাদেশের ভঙ্গুরতা ফুটিয়ে তোলার জন্য কেবল একটি একক আর্থিক সংখ্যাই যথেষ্ট নয়। জলবায়ু, হাইড্রোলজিক্যাল এবং অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে অনুমানের হিসাবও পরিবর্তিত হয়। এর মূল্যায়ন ও কারণ নির্ধারণের বিষয়গুলোও আলাদা। ক্ষতির আনুমানিক মূল্য হিসাব করলেই এটি প্রমাণিত হয় না যে উজানের একটি নির্দিষ্ট পদক্ষেপের কারণেই পুরো ক্ষতিটি হয়েছে। যে কোনো মূল্যায়নের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট দৃশ্যপট, স্পষ্ট ধারণা এবং সুস্পষ্ট অনিশ্চয়তার বিষয়গুলো থাকা প্রয়োজন।’
তিনি আরও বলেন, ‘যৌথ ঝুঁকি বুঝতে এবং ব্যবস্থাপনা করতে ব্যর্থ হলে তার মাসুল কেবল ভাটির দেশকেই নয়, বরং পুরো অববাহিকাকেই দিতে হতে পারে। চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অবকাঠামোগত ক্ষতি, পানির লভ্যতার পরিবর্তন, পলি সমস্যা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জীবিকা উজান ও ভাটির জনগোষ্ঠীকে ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে প্রভাবিত করতে পারে।’
কয়েক দশক ধরে আন্তঃসীমান্ত নদী নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান কেবল প্রতিক্রিয়াশীলই রয়ে গেছে। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশি প্রতিনিধি দল পানি বণ্টনের ফর্মুলা বা বন্যার পূর্বাভাসের অনুরোধ জানায়। আলোচনা থমকে গেলে অগ্রগতিও বন্ধ হয়ে যায়।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির রাজনৈতিক বিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল বাতেন যুক্তি দেন যে, বাংলাদেশকে অবশ্যই এই নিষ্ক্রিয় অবস্থান ত্যাগ করতে হবে এবং নিজস্ব গবেষণা সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘একটি ভাটির দেশ হিসেবে আমাদের ইকোসিস্টেম, মানুষের জীবিকা এবং সামগ্রিক অর্থনীতি কোনো না কোনোভাবে হিমবাহে যা ঘটে তা দ্বারা প্রভাবিত হবে। হিমবাহ গবেষণা সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তন গবেষণার সাথে যুক্ত। আর যেহেতু আমাদের অনেক নদী সরাসরি হিমালয় অঞ্চল থেকে উৎপন্ন হয়েছে, তাই সেসব হিমবাহের অবস্থা সরাসরি এই নদী ব্যবস্থার সাথে যুক্ত।’
আব্দুল বাতেন উল্লেখ করেন যে, পার্বত্য অঞ্চল না হওয়া সত্ত্বেও অনেক দেশ আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে নিয়মিত হিমবাহ সংক্রান্ত গবেষণা পরিচালনা করে থাকে। ইউরোপীয় ও আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নেপালের মতো আয়োজক দেশগুলোর সাথে যৌথভাবে হিমালয়ে স্থায়ী পর্যবেক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করছে।
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ এমন গবেষণা কেন্দ্র বা যৌথ কর্মসূচি গড়ে তুলতে পারে যেখানে বাংলাদেশের গবেষণা দলগুলো হিমালয় অঞ্চলের গবেষকদের সাথে একসাথে কাজ করবে।’
বাতেন পরামর্শ দিয়ে বলেন, ‘আমরা হিমবাহ গবেষণায় নেপালের সাথে সার্ক-স্তরের সহযোগিতা অথবা চীন ও ভারতের সাথে যৌথভাবে কাজ করতে পারি।’
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘পানি শাসনকে নদীর ওপর নির্মিত মানবসৃষ্ট কাঠামোগুলো থেকে আলাদা করা যায় না। বর্তমানে আমরা যখন ভারতের সাথে পানি সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করি, তখন আলোচনা কেবল ভূ-পৃষ্ঠের পানির স্তরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু আমাদের প্রাকৃতিক শক্তি—পানি, হিমবাহ এবং পর্বত সম্পর্কে তথ্যের প্রয়োজন। একই সাথে এই নদী ব্যবস্থার ওপর তৈরি করা জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, বাঁধ ও ব্যারেজগুলো সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য প্রয়োজন। কেবল বহুপাক্ষিক পানি-প্রবাহের তথ্য পেলেই খুব বেশি লাভ হবে না। আমাদের সেই পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণকারী মানবসৃষ্ট কাঠামোগুলো সম্পর্কেও বহুপাক্ষিক তথ্য প্রয়োজন।’
পিক ওয়াটার এবং মধ্য শতকের সম্ভাব্য বিপর্যয়
ম্যাকডাওয়েল এবং অন্যান্যদের করা গ্লেসিও-হাইড্রোলজিক্যাল গবেষণায় ‘পিক ওয়াটার’-এর মেকানিজম উঠে এসেছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন শুরুর দিকে বার্ষিক হিমবাহের প্রবাহ বাড়িয়ে দেয়, যা নদীর পানি প্রবাহ বৃদ্ধি করে। শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহ সাময়িকভাবে বজায় থাকলেও ভাটির মানুষ এগুলোকে গ্রীষ্মকালীন বন্যা, অতিরিক্ত পলির চাপ এবং নদী ভাঙন হিসেবে অনুভব করে।
যাইহোক, একটি হিমবাহ যখন তার ভর হ্রাসের মাত্রা অতিক্রম করে ফেলে তখন পানি প্রবাহ সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছায়। এরপর থেকে দীর্ঘমেয়াদী পতন শুরু হয়।
গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় পানিসম্পদ বিজ্ঞানীরা চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সর্বোচ্চ পানি প্রবাহের পূর্বাভাস দিয়েছেন। এটি শুষ্ক মৌসুমের সুপেয় পানির সরবরাহকে ক্রমেই নিঃশেষ করে দেবে। এই পানির প্রবাহই মূলত সমুদ্রের লোনা পানিকে আটকে রাখে।
জলবায়ু-প্ররোচিত লবণাক্ততা নিয়ে বিশ্বব্যাংকের গবেষণা বলছে, শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে গেলে লোনা পানি উপকূলের আরও ভেতরের দিকে চলে আসে। ইতোমধ্যেই দক্ষিণ-পশ্চিমের উপকূলীয় জেলাগুলোতে মাটির লবণাক্ততা ধানের ফলন কমিয়ে দিয়েছে।
গবেষণাগুলো সতর্ক করছে, উজানের প্রবাহ আরও কমলে লোনা পানি আবাদি জমিতে ছড়িয়ে পড়বে এবং সুন্দরবনের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দেবে। এটি হুট করে হওয়ার চেয়ে একটি ধীরগতির ক্ষতি—আর ঠিক এই কারণেই এটি এড়িয়ে যাওয়া বা পিছিয়ে দেওয়া সহজ হয়।
অন্যান্য অববাহিকায় ঘাটতিগুলো পূরণ করা হয়েছে
বাংলাদেশের এই কঠিন পরিস্থিতিকে একটি ভাটির দেশের স্বাভাবিক পরিণতি মনে হতে পারে। কিন্তু বিষয়টি তা নয়। অন্যান্য যৌথ অববাহিকায় সীমান্ত সংলগ্ন দেশগুলো নদীর তথ্যকে একটি জনসেবামূলক বিষয় হিসেবে দেখে। তারা তা প্রমাণ করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলেছে।
কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড এবং ভিয়েতনামের মতো মেকং নদীর ভাটির দেশগুলো সমগ্র অববাহিকাজুড়ে একটি অটোমেটেড স্টেশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে। এটি রিয়েল-টাইম ব্যবধানে একটি শেয়ার্ড ডেটাবেজে পানিপ্রবাহ ও বৃষ্টিপাতের তথ্য পাঠায়, যা যৌথ বন্যা ও খরা পূর্বাভাস ব্যবস্থাকে সচল রাখে।
এমনকি উজানের শক্তিশালী দেশ চীনও এতে অংশ নেয়; মেকং নদী কমিশনের সদস্য না হয়েও কেবল ‘সংলাপ অংশীদার’ হিসেবে চীন ২০০২ সাল থেকে ইউনানের দুটি স্টেশন থেকে হাইড্রোলজিক্যাল তথ্য শেয়ার করছে—যদিও দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে তা কেবল বর্ষা মৌসুমের জন্য ছিল, তবে একটি তীব্র খরা ও বৈশ্বিক চাপের পর ২০২০ সাল থেকে বছরজুড়ে ডেটা শেয়ার করা শুরু করে তারা।
অথবা ব্রহ্মপুত্রের ভাটির দেশগুলোকে যতটুকু তথ্য দেওয়া হয়, তার চেয়ে এটি অনেক বেশি।
রাইন নদী আরও এক ধাপ এগিয়ে। সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, লুক্সেমবার্গ এবং নেদারল্যান্ডস ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে যৌথভাবে একটি আইনি বাধ্যবাধকতামূলক সনদের অধীনে কাজ করে, যা পুরো ক্যাচমেন্ট অঞ্চলজুড়ে পর্যবেক্ষণকে সমন্বিত করে। এটি আন্তর্জাতিক রাইন সুরক্ষা কমিশন দ্বারা পরিচালিত হয়।
আন্তর্জাতিক ওয়ার্নিং অ্যান্ড অ্যালার্ম প্ল্যানের আওতায় উজানে কোনো দূষণ বা বন্যার আশঙ্কা দেখা দিলে তা নির্দিষ্ট সতর্কীকরণ কেন্দ্রের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে ভাটির দেশগুলোতে জানিয়ে দেওয়া হয়—যা একটি নিয়মমাফিক বিষয় এবং যেখানে কোনো কূটনৈতিক জটিলতা থাকে না।
সেনেগাল নদী সবচেয়ে দূরদর্শী পদক্ষেপ নিয়েছে। মালি, মৌরিতানিয়া, সেনেগাল এবং গিনি যৌথভাবে নদীর প্রধান বাঁধ মানান্তালি ও দিয়ামার ‘যৌথ ও অবিভাজ্য’ মালিক। তারা ‘অর্গানাইজেশন পোর লা মিস এন ভালুর দু ফ্লেভ সেনেগাল’-এর মাধ্যমে ব্যয় এবং আয় উভয়ই ভাগ করে নেয়।
বাংলাদেশ কী করতে পারে
ভাদুরীর মতে, এই সমস্যার সমাধান কোনো কূটনীতি দিয়ে নয়, বরং তথ্য ও প্রমাণ দিয়ে শুরু করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘প্রথম অগ্রাধিকার হলো পুরো অববাহিকাকে একটি একক ব্যবস্থা হিসেবে বোঝা। এর জন্য আর্থ অবজারভেশন, রিমোট সেন্সিং থেকে শুরু করে হাইড্রোলজিক্যাল মডেলিং এবং মেশিন লার্নিংয়ের মতো আধুনিক প্রযুক্তি এখন হাতের কাছেই রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্থলভাগের পর্যবেক্ষণের সাথে এই উৎসগুলোকে একত্রিত করা হলে তা বন্যা ও খরার পূর্বাভাস, ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং অববাহিকাজুড়ে পরিবর্তনের জ্ঞানকে উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করতে পারে। বিজ্ঞানীরা স্বচ্ছ পদ্ধতি, পরিমাপযোগ্য সূচক, পারস্পরিক ব্যবহারযোগ্য ডেটাসেট, যৌথ মডেলিং পদ্ধতি, শেয়ার্ড পূর্বাভাস সরঞ্জাম এবং যৌথ গবেষণা তৈরির মাধ্যমে অবদান রাখতে সক্ষম।’তবে কেবল তথ্য সংগ্রহের জন্য তথ্য জমা করা মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। ভাদুরী বলেন, ‘লক্ষ্য কেবল অতিরিক্ত ডেটা সংগ্রহে হওয়া উচিত নয়, বরং একটি উন্নত যৌথ সমঝোতা বা পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরি করা উচিত।’
রাষ্ট্রগুলো কীভাবে ডেটা ভাগাভাগিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে তা শেষ পর্যন্ত সরকারের বিষয়; তবে সময়োপযোগী, নির্ভরযোগ্য এবং তুলনামূলক তথ্যের বৈজ্ঞানিক প্রয়োজনীয়তা খুব স্পষ্ট, কারণ বন্যা, খরা এবং পলির প্রবাহ কোনো সীমান্ত মেনে চলে না।
রিভারাইন পিপলের প্রতিষ্ঠাতা ও সাধারণ সম্পাদক শেখ রোকন একই যুক্তিকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন।
তিনি বলেন, ‘এমনকি নেপাল, ভুটান ও চীন থেকে আসা পুরো তথ্যও একা যথেষ্ট হবে না। বাংলাদেশের যা অভাব রয়েছে তা হলো নদীগুলোকে নিয়ন্ত্রণকারী কাঠামোগুলো সম্পর্কিত সঠিক তথ্য। আমাদের প্রাকৃতিক শক্তি—পানি, হিমবাহ এবং পর্বত সম্পর্কে তথ্যেরও প্রয়োজন রয়েছে।’
একই সাথে, এই নদী ব্যবস্থাগুলোতে নির্মিত জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, বাঁধ এবং ব্যারেজগুলো সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্যের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছেন তিনি।

