একটি চাকরি পাওয়া অনেক নারীর জন্য নিজের পায়ে দাঁড়ানোর বড় একটি ধাপ। নিজের আয়, নিজের পরিচয় এবং নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সবকিছুর সঙ্গে চাকরি জড়িয়ে থাকে।
কিন্তু চাকরিতে ঢোকার পরই কি একজন নারীর লড়াই শেষ হয়ে যায়?
বাস্তবতায় অনেকের ক্ষেত্রে লড়াইটা বরং তখন থেকেই নতুন করে শুরু হয়।
একজন নারীকে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর শুধু নিজের কাজ ভালোভাবে করলেই হয় না। তাকে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হয়, দায়িত্ব নিতে হয় এবং অনেক সময় নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতাও বারবার দেখাতে হয়। এর সঙ্গে থাকে পরিবার ও সমাজের নানা প্রত্যাশা।
অফিস শেষ হলেও কাজ শেষ হয় না
একজন কর্মজীবী নারীর দিনের হিসাব করলে দেখা যায়, অফিসের সময়ের বাইরেও তার অনেক দায়িত্ব থাকে। রান্না, ঘর গোছানো, সন্তান ও পরিবারের অন্য সদস্যদের দেখাশোনা এসব কাজের বড় অংশ এখনো নারীর ওপর থাকে।
জাতিসংঘ নারী সংস্থা (ইউএন উইমেন) ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২১ সালের সময় ব্যবহারের জরিপে নারী ও পুরুষের কাজের ধরনে বড় পার্থক্য উঠে এসেছে। ইউএন উইমেন এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের নারীরা পুরুষের তুলনায় প্রায় ৭ দশমিক ৩ গুণ বেশি সময় অবৈতনিক যত্ন ও ঘরের কাজে ব্যয় করেন।
অর্থাৎ একজন নারী চাকরি করলেও ঘরের দায়িত্ব থেকে তিনি সবসময় মুক্তি পান না। অফিসের কাজ শেষ হওয়ার পরও তার জন্য অপেক্ষা করে আরেকটি কাজের তালিকা।
চাকরি আছে, কিন্তু সমান সুযোগ আছে তো?
কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু চাকরি পেলেই সমতা নিশ্চিত হয় না।
একজন নারী কতটা বেতন পাচ্ছেন, পদোন্নতির সুযোগ পাচ্ছেন কি না, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তার মতামত কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে এবং নেতৃত্বের জায়গায় যেতে পারছেন কি না এসব বিষয়ও দেখতে হবে।
ইউএন উইমেন -এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে কর্মরত নারীদের মাত্র ০ দশমিক ২৪ শতাংশ ব্যবস্থাপনা পদে রয়েছেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হার ১ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
এই পার্থক্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে নারীরা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করার পর নেতৃত্বের পর্যায়ে পৌঁছানোর সুযোগ কি সত্যিই সমানভাবে পাচ্ছেন?
বিয়ে ও মাতৃত্বের পর শুরু হয় নতুন প্রশ্ন
নারীর কর্মজীবনের সঙ্গে বিয়ে ও মাতৃত্বের বিষয়টিও প্রায়ই জড়িয়ে যায়। অনেক সময় একজন নারীর সামনে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যেখানে তাকে চাকরি ও সংসারের মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়ার চাপ অনুভব করতে হয়।
একজন পুরুষ বাবা হওয়ার পরও তার চাকরি চালিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু একজন নারী মা হওয়ার পর তাকে নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। যেমনঃ সন্তানকে কে দেখবে, সংসার কীভাবে চলবে, চাকরি সামলানো সম্ভব হবে কি না।
এই চাপের কারণে অনেক নারী চাকরিতে বিরতি নেন। কেউ চাকরি ছেড়ে দেন, আবার কেউ কয়েক বছর পর কর্মক্ষেত্রে ফিরতে চান। কিন্তু দীর্ঘ বিরতির পর আগের অবস্থানে ফিরে যাওয়া সবসময় সহজ হয় না।
নিজের সময়টুকু কোথায়?
কর্মজীবী নারীর জীবনে আরেকটি বিষয় প্রায়ই আড়ালে থেকে যায় নিজের জন্য সময়।
অফিস, যাতায়াত, সংসার, সন্তান এবং পরিবারের দায়িত্ব শেষ করার পর একজন নারীর নিজের জন্য কতটা সময় থাকে? বিশ্রাম, ঘুম, শখ কিংবা নিজের যত্নের জন্য যে সময় প্রয়োজন, সেটিও অনেক সময় অন্য দায়িত্বের নিচে চাপা পড়ে যায়।
ইউএন উইমেন-র সময় ব্যবহারের জরিপে নারী ও পুরুষ দৈনন্দিন জীবনে কীভাবে সময় ব্যয় করেন, তা তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে ঘরের কাজ ও পরিবারের সদস্যদের দেখাশোনার মতো অবৈতনিক কাজের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের বড় পার্থক্য দেখা যায়।
এই কাজগুলোর অর্থনৈতিক মূল্য সবসময় হিসাব করা না হলেও একটি পরিবারের জীবন চালাতে এগুলোর গুরুত্ব অনেক।
তাহলে লড়াইটা কার?
একজন নারী সব দায়িত্ব একাই সামলাতে পারছেন এটিকে তার সাফল্যের মাপকাঠি বানানো উচিত নয়।
একজন নারীকে একই সঙ্গে ভালো কর্মী, ভালো মা, ভালো স্ত্রী এবং ভালো গৃহিণী হওয়ার চাপ দেওয়া হলে তার নিজের জন্য সময় ও সুযোগ কতটা থাকে, সেটিও ভাবতে হবে।
কর্মক্ষেত্রে সমতা মানে শুধু নারীদের চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া নয়। তাদের পদোন্নতি, নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং নিজের ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগও নিশ্চিত করা দরকার।
একইভাবে পরিবারেও দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি হওয়া প্রয়োজন। ঘরের কাজ শুধু নারীর দায়িত্ব এই ধারণা বদলানো ছাড়া কর্মজীবী নারীর ওপর চাপ কমানো কঠিন।
নারীর চাকরি নিয়ে তাই শুধু এই প্রশ্ন করলেই হবে না যে, ‘কতজন নারী কাজ করছেন?’
প্রশ্ন হওয়া উচিত, ‘চাকরিতে ঢোকার পর তারা কতটা এগোতে পারছেন?’
কারণ একটি চাকরি একজন নারীর হাতে শুধু বেতন তুলে দেয় না। এটি তাকে নিজের পরিচয় তৈরি, নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগও দেয়।
সেই সুযোগ যদি কর্মক্ষেত্রের বৈষম্য, সামাজিক প্রত্যাশা কিংবা ঘরের অতিরিক্ত দায়িত্বের চাপে সীমিত হয়ে যায়, তাহলে চাকরিতে প্রবেশ করাটাই শেষ কথা নয়।
নারীর লড়াই তখনও চলতে থাকে নিজের জায়গা তৈরি করার জন্য, নিজের সময় ফিরে পাওয়ার জন্য এবং নিজের যোগ্যতার যথাযথ মূল্য পাওয়ার জন্য।

