জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের আবহে ইরানযুদ্ধ ঘিরে কূটনৈতিক তৎপরতা নতুন গতি পেয়েছে। প্রায় সাত মাস ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের সংঘাতের মধ্যে নিউইয়র্কে প্রথমবারের মতো দীর্ঘ সময় ধরে বৈঠক করেছে ওয়াশিংটন ও তেহরানের প্রতিনিধিরা। একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরব ও মুসলিম দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া এবং বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে।
ইরানযুদ্ধের অবসানে তেহরান তাদের শর্তগুলো স্পষ্ট করেছে। দেশটি যুদ্ধের সব ফ্রন্টে অবসান, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, জব্দ করা ইরানি সম্পদ ছাড় এবং অর্থনৈতিক যুদ্ধ ও মার্কিন আগ্রাসন বন্ধের দাবি জানিয়েছে। বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছে তেহরান। এই অবস্থায় যুদ্ধের সামরিক ফলের পাশাপাশি হরমুজের নিয়ন্ত্রণ, কূটনৈতিক শর্ত এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান খোঁজার প্রশ্নটি সামনে এসেছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে মঙ্গলবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে বৈঠক হয়। মার্কিন প্রতিনিধি দলে উইটকফের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারও ছিলেন। প্রায় তিন ঘণ্টার এই আলোচনা ছিল জুনের মাঝামাঝির পর দুই দেশের মধ্যে প্রথম সরাসরি কূটনৈতিক যোগাযোগ।
কাতারের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ হয় বলে বুধবার নিশ্চিত করেছেন ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। তিনি ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ
সংস্থা আইআরএনএকে বলেন, আলোচনার উদ্দেশ্য ছিল তেহরানের শর্তগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
বাঘাই জানান, আরাগচি যুদ্ধের সব ফ্রন্টে অবসান, তেহরানের ভাষায় যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন বন্ধ, নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, অর্থনৈতিক যুদ্ধের অবসান এবং জব্দ করা ইরানি সম্পদ মুক্তির দাবি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও কূটনীতির শর্ত নিয়ে ইরান গত সপ্তাহেই তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। নিউইয়র্কে ইরানি প্রতিনিধিদল সেই অবস্থানই মার্কিন পক্ষের কাছে তুলে ধরেছে।
উইটকফ বলেন, মধ্যস্থতাকারীরা দিনভর দুই পক্ষের মধ্যে যাতায়াত করে দীর্ঘ আলোচনা সম্পন্ন করেছেন। তিনি আলোচনাকে ‘গঠনমূলক ও আশাব্যঞ্জক’ হিসেবে বর্ণনা করেন এবং মধ্যস্থতা অব্যাহত থাকবে বলে জানান।
ট্রাম্পও বৈঠককে ‘খুব ভালো’ ও ‘খুব ফলপ্রসূ’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আলোচনা প্রায় তিন ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছে এবং খুব শিগগিরই আরেক দফা বৈঠক হতে পারে।
তবে এই বৈঠকের কয়েক ঘণ্টা আগেই জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ইরানকে কঠোর হুমকি দেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি হবে কিনা, যার মাধ্যমে দেশটি পুনর্গঠন করতে পারেÑ এ বিষয়ে তাকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একই সঙ্গে তিনি ইরানকে ‘ধ্বংস’ করার হুমকিও দেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, তেহরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। তবে এর জন্য তাৎক্ষণিকভাবে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, জব্দ করা সব ইরানি সম্পদ ছাড় এবং সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধের শর্ত দিয়েছে দেশটি। বাঘাই পরে এর সঙ্গে অর্থনৈতিক যুদ্ধের অবসান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সব ‘আগ্রাসী কর্মকাণ্ড’ বন্ধের দাবিও যুক্ত করেন।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইএসএনএকে দেশটির রাষ্ট্রদূত কাজেম জালালি বলেন, হরমুজ প্রণালির নতুন আইনগত মর্যাদা নির্ধারণ করবে ইরান ও ওমান। যুক্তরাষ্ট্র এই জলপথ দিয়ে চলাচল অব্যাহত রাখতে চাইলে সেই নতুন মর্যাদা মেনে নিতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের অবস্থানের মধ্যেই মঙ্গলবার একটি পণ্যবাহী জাহাজে অজ্ঞাত একটি বস্তু আঘাত হানার খবর দিয়েছে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও। সংস্থাটি জানায়, জাহাজটিতে আগুন ধরে যায় এবং সেটি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ভাসতে থাকে। সব ক্রুকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং দুজন হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির কোনো খবর পাওয়া যায়নি। ঘটনার তদন্ত চলছে। হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে চলাচলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
যুদ্ধের কারণে হরমুজ ও লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর নেতারা এর অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে মঙ্গলবার আরব ও মুসলিম দেশগুলোর নেতাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন ট্রাম্প। এতে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত দেশগুলোর নেতাদের পাশাপাশি মিসর, তুরস্ক, লেবানন, সিরিয়া ও ইরাকের নেতা ও প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
বৈঠকে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের অব্যাহত অচলাবস্থার প্রভাব গুরুত্ব পায়। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে।
এদিকে যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনে আরব দেশগুলোর সঙ্গে ১০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিনিয়োগ তহবিল গঠনের প্রস্তাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনা করছে বলে জানিয়েছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিন ব্যক্তির বরাত দিয়ে সংবাদপত্রটি জানিয়েছে, জাতিসংঘের বৈঠকের আগে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করেছেন।
আরব নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের আগে প্রকাশ্য বক্তব্যে ট্রাম্প গাজায় একটি ‘ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি’ হয়েছে বলে দাবি করেন এবং ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান নিয়ে কথা বলেন। বক্তব্যের একপর্যায়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানকে দেখিয়ে তাকে ‘কঠিন মানুষ’ এবং ‘দারুণ ব্যক্তি’ বলে মন্তব্য করেন।
ট্রাম্পের ইরানকে ‘ধ্বংস’ করার হুমকির পর দেশটির সামরিক নেতৃত্ব পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ইরানের জেনারেল স্টাফ এক বিবৃতিতে ট্রাম্পের বক্তব্যকে ইরানের বিরুদ্ধে ‘আগ্রাসন’কে বৈধতা দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করে। তাদের ভাষ্য, এ ধরনের হুমকি যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির নয়, বরং কৌশলগত অচলাবস্থার ইঙ্গিত।
ইরানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আগের যুদ্ধের চেয়েও ‘আরও বিধ্বংসী ও অনির্দেশ্য’ হামলা চালানোর সক্ষমতা নিয়ে তারা প্রস্তুত রয়েছে।
ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) স্থলবাহিনীর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ কারামি উত্তর-পশ্চিম ইরানের সামরিক ঘাঁটি পরিদর্শনের সময় বলেন, ইরান শত্রুর কাছে ‘এক ইঞ্চিও নতি স্বীকার করবে না’। ১৯৮০-৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধের কথা উল্লেখ করে তিনি প্রতিরোধ ও দৃঢ়তার নীতি অব্যাহত রাখার কথা বলেন।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাঘাই বলেছেন, যুদ্ধের হুমকি মোকাবিলায় সংলাপ ও শান্তির বিকল্প কোনো অস্ত্র নেই। আইএসএনএকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, শান্তি শুধু যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়; এর সঙ্গে স্থিতি ও সমৃদ্ধিও যুক্ত। তার ভাষায়, প্রতিপক্ষের আক্রমণাত্মক সরঞ্জামের কার্যকারিতা কমানোর ক্ষেত্রে সংলাপ ও শান্তির সমকক্ষ কোনো অস্ত্র নেই।
আরব পার্সপেকটিভস ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক জেইডন আলকিনানি আল জাজিরাকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের একটি সমাধান খুঁজতে চাইছে। তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি সমাধান চায়, যাতে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে একটি ‘প্রতীকী বিজয়’ দেখানো যায় এবং সেটি দেশের অভ্যন্তরীণ ভোটার ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছে উপস্থাপন করা সম্ভব হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসকে ভিসা না দেওয়ার বিষয়েও আলকিনানি মন্তব্য করেন। তার মতে, এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ফিলিস্তিনি কর্র্তৃপক্ষের অবস্থানগত দূরত্ব রয়েছে। জাতিসংঘে ভিসা ব্যবস্থাকে যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছেÑ এমন দাবিও তিনি করেন।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার পাশাপাশি ইয়েমেনের যুদ্ধও নতুন করে তীব্র হয়েছে। দেশটির তাইজ ও লাহিজ প্রদেশ এবং পশ্চিম উপকূলকে যুক্ত করা কৌশলগত ত্রিভুজ এলাকায় সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে তীব্র লড়াই চলছে।
সরকারি বাহিনী জানিয়েছে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কাহবুব পর্বতমালায় হুথিদের একটি আক্রমণ তারা প্রতিহত করেছে। ন্যাশনাল শিল্ড ব্রিগেডের দাবি, পাহাড়ি এলাকায় হুথিদের তিনটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। বাহিনীটির ভাষ্য, ড্রোনগুলো সরকারি অবস্থানে পৌঁছানোর আগেই প্রতিহত করা হয়।
সাউদার্ন জায়ান্টস ব্রিগেডও জানিয়েছে, তারা হুথিদের ঘাঁটি ও অতিরিক্ত সেনা পাঠানোর প্রস্তুতির বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারি বাহিনীর দাবি, কাহবুব এলাকার বড় অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং দক্ষিণাঞ্চলের গ্রামীণ এলাকায় হুথিরা কয়েকটি ছোট অবস্থানে সীমিত হয়ে পড়েছে।
এদিকে হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানিয়েছেন, তাইজের মোচা এলাকায় একটি সশস্ত্র গোয়েন্দা ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। তার দাবি, ড্রোনটি ‘শত্রুতামূলক মিশনে’ ছিল এবং ‘উপযুক্ত অস্ত্র’ ব্যবহার করে সেটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
আল জাজিরার সূত্রগুলো জানিয়েছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইয়েমেনের যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের ব্যবহার বেড়েছে এবং কয়েকটি ড্রোন সামরিক অবস্থানে গোলাবারুদ নিক্ষেপ করেছে। চলতি মাসের শুরুতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের অনুগত বাহিনীর বিরুদ্ধে অগ্রগতি অর্জনের পর ইরান-সমর্থিত হুথিরা আবারও আন্তর্জাতিক নজরে এসেছে। এতে লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকায় তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও বেড়েছে।

